এবার ঢাকা ছাড়াই কঠিন হতে পারে

title
এক মাস আগে
আসন্ন ঈদ যাত্রায় ঢাকা ছাড়ার সবচেয়ে বড় বাধা হতে পারে ঢাকা নিজেই। রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে যানজট এমনিতেই যেন স্বাভাবিক এক ঘটনা। কোরবানির ঈদে সেটিআরো বেড়ে যায় অস্থায়ী পশুর হাট ও পশুবাহী যানবাহনের চলাচলের কারণে। এর সঙ্গে এবার যুক্ত হবে পদ্মা সেতু অভিমুখী যানবাহনের ঢাকা থেকে বের হওয়ার চাপ। বিজ্ঞাপন সব মিলিয়ে এবার ঈদ যাত্রায় ঢাকা থেকে বের হতে বিড়ম্বনা পোহাতে হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে ঢাকা থেকে বের হতে পারলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলগামী যানবাহনগুলো আর কোনো ঝক্কি ছাড়াই পদ্মা সেতু পেরিয়ে গন্তব্যে যেতে পারবে। সড়কের পাশাপাশি ঈদ যাত্রায় বরাবর আলোচনায় থাকে রেল, লঞ্চ ও ফেরিঘাট। এবার ফেরির পথ স্বাভাবিক থাকবে বলে ধারণা বিশেষজ্ঞদের। ফলে যাত্রীরা স্বচ্ছন্দে যেতে পারবে। আর রেলওয়েতে বরাবরের মতো যাত্রীর চাপ থাকবে, তবে তুলনামূলকভাবে যাত্রী কমবে লঞ্চে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় দক্ষিণাঞ্চলের বেশির ভাগ বাস সেতু দিয়ে পদ্মা নদী পারি দেবে। এতে ঢাকা থেকে দক্ষিণাঞ্চলগামী বাসের চাপ বাড়বে রাজধানীর সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ী ও গুলিস্তান এলাকায়। পদ্মা সেতুতে যাওয়ার জন্য এসব এলাকার বাস মেয়র হানিফ উড়াল সড়ক দিয়ে যাত্রাবাড়ী, পোস্তগোলা হয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মহাসড়কে (ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ে) উঠবে। আবার ওই পথ ব্যবহার করার জন্য গাবতলী ও মহাখালী টার্মিনালের বাসও ঢাকার মধ্য দিয়ে ওই সব এলাকায় যাবে। সেই সঙ্গে যুক্ত হবে ছোট ও ব্যক্তিগত গাড়ি। আর ঢাকার মধ্যে নিয়মিত চলা যানবাহন তো রয়েছেই। আবার যারা নারায়ণগঞ্জ হয়ে ঢাকা ছাড়বে তাদের চাপও পড়বে এসব এলাকায়। এ ছাড়া যোগ হবে পোস্তগোলা শ্মশানঘাট, মেরাদিয়া বাজার, কমলাপুর স্টেডিয়াম, যাত্রাবাড়ী দনিয়া কলেজ, ধোলাইখাল ট্রাক টার্মিনাল এলাকায় অস্থায়ী পশুর হাটের চাপ। সব মিলিয়ে ঈদ যাত্রায় ঢাকা থেকে বের হওয়া বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে। এ বিষয়ে যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামছুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ঢাকার রাস্তাগুলো অতিরিক্ত চাপ নেওয়ার জন্য প্রস্তুত নয়। এটা ভাবনার বিষয়। পদ্মা সেতুকে কেন্দ্র করে ঢাকার পোস্তগোলা, হানিফ ফ্লাইওভার, বাবুবাজার এলাকায় অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হবে। এ সময়টায় ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় নজর দিতে হবে। ঢাকা থেকে বের হওয়ার মুখটা স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করতে হবে। তিনি আরো বলেন, এই পথে যেহেতু নতুন রুট তৈরি হয়েছে, তাই এখন বাসের সংখ্যা বেড়ে যাবে। তবে আশঙ্কা সৃষ্টি করবে ব্যক্তিগত গাড়ি। দক্ষিণাঞ্চলে যারা লঞ্চে যেত তাদের অনেকেই এবার আবেগের বশে ছোট ছোট গাড়ি নিয়ে পদ্মা সেতু দিয়ে বাড়ি যাবে। ফলে ঢাকার ভেতরে ছোট গাড়ির চাপ অনেক বাড়বে। মহাসড়ক পরিস্থিতি ঢাকা থেকে বের হওয়ার পর এবারের ঈদ যাত্রায় চার মহাসড়কে বড় ভোগান্তির শঙ্কা রয়েছে। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের চান্দিনা চৌরাস্তার জাগ্রত চৌরঙ্গি মোড় পার করে ঢাকার দিকে এগোলেই ভোগড়া পর্যন্ত মহাসড়কের বিভিন্ন জায়গায় গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। এ ছাড়া চান্দনা চৌরাস্তা উড়ালপথের খুঁটির ভিত তৈরি করার জন্য খোঁড়া গর্তের কারণে যান চলাচলের পথ ছোট হয়ে এসেছে। তৈরি হচ্ছে যানজট। ঈদ যাত্রায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ভোগড়া থেকে চান্দনা চৌরাস্তা ভোগান্তির কারণ হতে পারে। গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (ট্রাফিক) উপকমিশনার মো. আবদুল্লাহ আল মামুন কালের কণ্ঠকে জানান, চান্দনা চৌরাস্তা, গাজীপুরার তায়রুননেছা মেডিক্যাল কলেজ ও মিলগেটে ফ্লাইওভারের কাজ চলছে। তাই গর্ত ও খোঁড়াখুঁড়ির কারণে ওই সব স্থানে সড়ক বেহাল। বৃষ্টি হলেই টঙ্গীর পাখিরবাজার, মিলগেট, টঙ্গীর খাঁপাড়া সড়কের মাথা, তায়রুননেছা মেডিক্যাল কলেজ, বড়বাড়ির গাছা রোডের মাথা, বোর্ডবাজার ও ছয়দানায় পানি জমে যায়। তিনি বলেন, টঙ্গী-ঘোড়াশাল-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কের টঙ্গী হাসপাতালের সামনে পানি জমে। এর প্রভাবে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে যানজট সৃষ্টি হয়। তবে সবচেয়ে বেহাল ভোগড়ার কলাম্বিয়া গার্মেন্ট থেকে চান্দনা চৌরাস্তা পর্যন্ত প্রায় দেড় কিলোমিটার অংশ। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার চান্দিনা-বাগুর বাসস্টেশন এলাকায় যানজটের আশঙ্কা রয়েছে। যেখানে-সেখানে গাড়ি পার্কিং, বাস বে ও ফুট ওভারব্রিজ ব্যবহার না করা, ফুটপাত দখলের কারণে মহাসড়কে দু-তিন কিলোমিটার যানজট দীর্ঘ হয়। যানজট কমাতে সড়ক দখলমুক্ত করার কাজ চলছে। অভিযানের পাশাপাশি চান্দিনা-বাগুর বাসস্টেশন এলাকার নিচু বিভাজনে কাঁটাতারের বেড়া দিতে যাচ্ছে সড়ক ও জনপথ বিভাগ। এদিকে পদ্মা সেতু চালুর পর ভাঙ্গা-বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়কে যানজটের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। পদ্মা সেতুর সুফল পেতে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষকে চরম ভোগান্তিতে ফেলবে ২০৫ কিলোমিটারের ভাঙ্গা-বরিশাল-কুয়াকাটার অপ্রশস্ত সড়ক। সেতু অতিক্রম করে ফরিদপুরের ভাঙ্গা মোড় পর্যন্ত ৪২ কিলোমিটার রাস্তায় দক্ষিণাঞ্চলমুখী ২১ জেলার সব যানবাহনের গতি থাকে প্রায় একই রকম। কিন্তু ভাঙ্গায় এক্সপ্রেসওয়ে শেষে বাঁ দিকে বাঁক নেওয়া যানবাহনগুলোর গতি কমে যাবে। যানবাহনগুলোকে তখন মাত্র ২৪ ফুট প্রশস্ত সড়কে চলতে হয়। পদ্মা সেতু চালুর পর অতিরিক্ত যানবাহনের চাপে ভাঙ্গা থেকে বরিশাল বিভাগমুখী যানবাহনের গতি আরো কমার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সঙ্গে গাড়ির চাপ বাড়লে যানজট বাড়বে। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, চন্দ্রাতে একটু সংস্কারের ব্যবস্থা করা গেলে যাতায়াত করাটা সুবিধা হয়। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে বরাবর দুর্ভোগ। এই সড়কে অন্তত চারটা বড় পশুর হাট থাকে। ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেনের মহাসড়ক পণ্যবাহী কাভার্ড ভ্যানের দখলে থাকে। এতে যাত্রায় সময় বেড়ে যাচ্ছে। চার ঘণ্টার পথ ছয় ঘণ্টায় যেতে হয়। মেঘনা, মদনপুর, কাচপুর সেতুও ঈদ যাত্রায় ভোগাতে পারে। তিনি বলেন, সড়ক ও মহাসড়ক দখলমুক্ত করা হচ্ছে না। উল্টো সড়কে পশুর হাট বসবে। যাত্রীবাহী বাসের সঙ্গে থাকবে পণ্যবাহী ট্রাক ও পশুবাহী ট্রাক। ঢাকায় সার্কুলার রোড না থাকায় এবং ঢাকার প্রবেশমুখগুলোতে সঠিক ব্যবস্থাপনা না থাকায় পুরো চাপ পড়বে ঢাকার ভেতরে। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী এ কে এম মনির হোসেন পাঠান কালের কণ্ঠকে বলেন, পদ্মা সেতু পার হওয়ার পর গাড়ির চাপ তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে যাবে। ফলে বরিশালমুখী খুব চাপ পড়বে না। অন্যান্য সড়কে চাপ যেন স্বাভাবিক থাকে সেদিকে নজর রাখা হচ্ছে। পুলিশের সাহায্য নেওয়া হবে। অনেক জায়গায় সড়ক সংস্কার করে প্রস্তুত করা হচ্ছে। লঞ্চে যাত্রীর চাপ কমবে ঈদে লঞ্চে যাত্রীর উপচে পড়া ভিড় যেন নিয়মিত চিত্র। তবে ঢাকা থেকে লঞ্চে যাত্রীর চাপ সড়কে আসার সম্ভাবনা হয়েছে পদ্মা সেতুর জন্য। যাত্রীর চাপ ঢাকা থেকে একেবারে কমে না। লঞ্চ মালিকদের সংগঠন বিআইডাব্লিউপিসিএর ভাইস প্রেসিডেন্ট বদিউজ্জামান বাদল বলেন, লঞ্চের স্বাভাবিক অবস্থা আর নেই। মনে হচ্ছে, এবার যাত্রীসংকটে ভুগতে হবে। পদ্মা সেতু হয়ে যাওয়ায় এই মুহূর্তে কোনো যাত্রী পাচ্ছি না। ঈদেও এমনই অবস্থা থাকবে বলে মনে হচ্ছে। মহাসড়কে মোটরসাইকেল গত ঈদে মহাসড়কে মোট দুর্ঘটনার মধ্যে বেশির ভাগ ছিল মোটরসাইকেলকেন্দ্রিক। তাই এই ঈদে মহাসড়কে মোটরসাইকেল বন্ধের সুপারিশ করেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এই সুপারিশ বাস্তবায়ন হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক বলেন, মোটরসাইকেল বন্ধের সিদ্ধান্ত হবে আত্মঘাতী। কেননা, আমাদের গণপরিবহনব্যবস্থা তেমন ভালো নয়। ফলে সবাই বাসের বিকল্প চায়। তবে মোটরসাইকেল যেন স্বাভাবিকভাবে চলাচল করে, তাতে যেন অতিরিক্ত ব্যাগ ও যাত্রী পরিবহন করা না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। রেলের টিকিট কাল থেকে ঈদকে কেন্দ্র করে আগামীকাল শুক্রবার থেকে রেলের অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরু হতে যাচ্ছে। এবার ঢাকার সাতটি স্টেশন থেকে রেলের অগ্রিম টিকিট বিক্রি করা হবে। সব জায়গার টিকিট কমলাপুরে পাওয়া যাবে না। কাউন্টারের পাশাপাশি ওয়েবসাইট ও মোবাইল অ্যাপে রেলের টিকিট কেনা যাবে। তবে টিকিট কিনতে দেখাতে হবে জাতীয় পরিচয়পত্র। গাড়ির অপেক্ষায় ফেরি দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌপথের দূরত্ব তিন কিলোমিটার। প্রতিদিন সেখানে কয়েক হাজার বিভিন্ন গাড়ি ফেরি পারাপার হয়। ফেরিসংকট, ঘাট সমস্যাসহ নানা সংকটের পাশাপাশি অতিরিক্ত গাড়ির চাপে প্রায় বছরজুড়ে ওই নৌপথের উভয় ঘাটে যানজট লেগে থাকত। দুর্ভোগের শিকার হতো পরিবহন চালকসহ যাত্রী। কিন্তু এখন সেই চিত্র বদলে গেছে। এখন ফেরির অপেক্ষায় গাড়ি নয়, গাড়ির অপেক্ষায় থাকছে ফেরি। এবার ঈদে ফেরিঘাটে বাসের উপচে পড়া ভিড় থাকবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হোসেন মো. মজুমদার বলেন, এত দিন ফেরির জন্য গাড়ি অপেক্ষা করেছে, এখন গাড়ির জন্য ফেরি অপেক্ষা করবে। ঈদের সময়ও চিত্র এমনই থাকবে। এখন কেউ আর ফেরি দিয়ে পার হতে চাইবে না। সবাই এখন পদ্মা সেতু ব্যবহার করে তাড়াতাড়ি চলে যাবে। তিনি বলেন, এবার অবশ্যই স্বস্তিদায়ক ঈদ হবে। দক্ষিণাঞ্চলের লোকজন খুব স্বচ্ছন্দে ঢাকা ছাড়তে পারবে। লঞ্চের ওপর থেকেও চাপ কমবে। বরিশালের বাসিন্দারা আর তেমন লঞ্চে উঠবে বলে মনে হয় না। তবে ভোলার লোকেরা লঞ্চে যাতায়াত করবে। কেননা, ভোলায় সরাসরি বাসে যাতায়াত করা যাচ্ছে না। (প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রতিনিধিরা)