স্কুল-মাদরাসার ৭৬৭ ছাত্র-ছাত্রীর বাল্যবিয়ে

title
এক মাস আগে
করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দেড় বছর বন্ধ থাকার সুযোগে জয়পুরহাটের পাঁচবিবি উপজেলার ৩৩টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং ১১টি মাদরাসার ৭৬৬ ছাত্রী ও এক ছাত্রের বাল্যবিয়ে হয়েছে। ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি এবং চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষার্থীদের বিয়ের ঘটনা বেশি ঘটেছে। গত ১২ সেপ্টেম্বর স্কুল ও মাদরাসা খোলার পর এই বিপুলসংখ্যক বাল্যবিয়ের বিষয়টি জানা যায়। তবে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাল্যবিয়ের তথ্য দেয়নি। বাল্যবিয়ের কারণে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি কমে গেছে। প্রশাসন ও প্রতিষ্ঠান প্রধানদের দাবি, করোনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় তাঁরা বাল্যবিয়ের ঘটনা সম্পর্কে জানতে পারেননি। গোপনে এসব বিয়ে দেওয়া হয়েছে। অনুসন্ধানে ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পাঁচবিবির আটটি ইউনিয়ন এবং একটি পৌর এলাকায় ৪৯টি বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৩৩টির ৫৬৩ জন ছাত্রী ও একজন ছাত্রের বাল্যবিয়ে হয়েছে। বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধানরা বাল্যবিয়ের তথ্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। এ ছাড়া ৩০টি মাদরাসার মধ্যে ১১টির ২০৩ জন শিক্ষার্থীর বাল্যবিয়ে হয়েছে। উপজেলার বাগজানা ইউনিয়নের রতনপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে ২০ জন ছাত্রীর, সোনাপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে আটজন ছাত্রীর, জীবনপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ৩৫ জন ছাত্রীর এবং বাগজানা আছিরিয়া মাদরাসার পাঁচজন ছাত্রীর বাল্যবিয়ে হয়েছে। এই ইউনিয়নের বাগজানা উচ্চ বিদ্যালয়, রামভদ্রপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও সোনাপুর মাদরাসার অনেক শিক্ষার্থীর বাল্যবিয়ে হলেও প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান শিক্ষকরা সংখ্যা জানাতে টালবাহানা করেন। ধরঞ্জি ইউনিয়নের ধরঞ্জি উচ্চ বিদ্যালয়ের ২৫ জন ছাত্রীর, রতনপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ২০ জন ছাত্রীর, কোতালীবাগ উচ্চ বিদ্যালয়ের তিনজন ছাত্রীর, শ্রীমন্তপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের সাতজন ছাত্রীর, ধরঞ্জি মাদরাসার ৩০ জন ছাত্রীর, উচনা মাদরাসার ২০ জন ছাত্রীর বাল্যবিয়ে হয়েছে। আয়মা রসুলপুর ইউনিয়নের রসুলপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ১০ জন ছাত্রীর, আয়মা হাজি মুনির উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ের ১৬ জন ছাত্রীর, আয়মা বালিকা বিদ্যালয়ের ১৭ জন ছাত্রীর, মালিদহ উচ্চ বিদ্যালয়ের ১২ জন ছাত্রীর, আগাইর উচ্চ বিদ্যালয়ের ১৫ জন ছাত্রীর, কড়িয়া ইসলামিয়া মাদরাসার ৪৭ জন ছাত্রীর, বুধইল মাদরাসার দুজন ছাত্রীর বাল্যবিয়ে হয়েছে। বালীঘাটা ইউনিয়নের বীরনগর উচ্চ বিদ্যালয়ের ১৯ জন ছাত্রী ও একজন ছাত্রের, কোকতারা উচ্চ বিদ্যালয়ের ১২ জন ছাত্রীর ও আটুল মাদরাসার ৯ জন ছাত্রীর বাল্যবিয়ে হয়েছে। আটাপুর ইউনিয়নের মহিপুর মাওলানা ভাসানী উচ্চ বিদ্যালয়ের ২০ জন ছাত্রীর, নীলতা উচ্চ বিদ্যালয়ের একজন ছাত্রীর, দিবাকরপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ১০ জন ছাত্রীর, উচাই বালিকা বিদ্যালয়ের ২০ জন ছাত্রীর বাল্যবিয়ে হয়েছে। এই ইউনিয়নের নীলতা উচ্চ বিদ্যালয়ে একজনের বেশি শিক্ষার্থীর বাল্যবিয়ে হলেও সংখ্যাটা জানাতে চাননি প্রধান শিক্ষক। মোহাম্মদপুর ইউনিয়নের বিনধারা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ২৪ জন ছাত্রীর, বারোকান্দি উচ্চ বিদ্যালয়ের ১২ জন ছাত্রীর, সরাইল উচ্চ বিদ্যালয়ের ১৮ জন ছাত্রীর, খোকশ গাড়ী মাদরাসার ২৫ জন ছাত্রীর, মোহাম্মদপুর মাদরাসার ২০ জন ছাত্রীর; কুসুম্বা ইউনিয়নের ধুরইল উচ্চ বিদ্যালয়ের ২৩ জন ছাত্রীর, হাবিবপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ২৫ জন ছাত্রীর, হাকিমপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ১৩ জন ছাত্রীর, শালাইপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ১১ জন ছাত্রীর, জয়হার মাদরাসার আটজন ছাত্রীর, কাটাপুকুর মাদরাসার ৩০ জন ছাত্রীর বাল্যবিয়ে হয়েছে। আওলাই ইউনিয়নের পিয়ারা ছাতীনালী উচ্চ বিদ্যালয়ের ৩০ জন ছাত্রীর, শাইলট্রি উচ্চ বিদ্যালয়ের ১০ ছাত্রীর, জাবেকপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ১৫ ছাত্রীর, জাতাইর পাগলা বাজার বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ২৫ ছাত্রীর, কাঁকড়া পিংলু উচ্চ বিদ্যালয়ের ৭৫ ছাত্রীর, গোড়না দাখিল মাদরাসার সাতজন ছাত্রীর বাল্যবিয়ে হয়েছে। পৌর এলাকার পৌর উচ্চ বিদ্যালয়ের আটজন ছাত্রীর, পৌর আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের ১১ ছাত্রীর ও দারুল ইসলাহ একাডেমির ১০ জন ছাত্রীর বাল্যবিয়ে হয়েছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, কঠোর লকডাউনের সময়েও গোপনে বহু বিয়ের আয়োজন করা হয়। ১০ থেকে ১২ জনের উপস্থিতিতে সন্ধ্যায় বা গভীর রাতে নিজ বা অন্য এলাকায় নিয়ে গিয়ে বিয়ের আয়োজন করা হতো। বাল্যবিয়ের ঘটনায় সরকারি বিধান অনুযায়ী বয়স না হওয়ায় সাদা কাগজে উপস্থিত সাক্ষী ও নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পের মাধ্যমে দেনমোহরের পরিমাণ উল্লেখ করে এবং মেয়ের পূর্ণ বয়স হওয়ার পর রেজিস্ট্রি করা হবেএই শর্তে বাল্যবিয়ের আয়োজন করা হয়। সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তি ও জনপ্রতিনিধিরা জানলেও কেউ কোনো পদক্ষেপ নেননি। অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবশালীদের টাকা দিয়ে ম্যানেজ করে বিয়ের আয়োজন করা হয়। এক ছাত্রীর মা বলেন, মেয়ে বড় হয়ে যাচ্ছে, স্কুল খুলছে না, লেখাপড়া নেই, এলাকার যুবকরা মেয়েকে উত্ত্যক্ত করে। তাই বিয়ে দিয়ে দিছি। আয়মা রসুলপুর হাজি মুনির উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শামছুল ইসলাম বলেন, স্কুল বন্ধ থাকার সুযোগে অষ্টম শ্রেণি থেকে এসএসসি পরীক্ষার্থীদের বিয়ে হয়ে গেছে। জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসন না এগিয়ে এলে বাল্যবিয়ে ঠেকানো সম্ভব নয়। কাঁকড়া পিংলু উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শাহিনুর ইসলাম বলেন, স্কুল খোলার পর দেখি আমার স্কুলের ৭৫ জন ছাত্রীর বিয়ে হয়ে গেছে। স্কুলে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি কমে গেছে। পাঁচবিবি থানার ওসি পলাশ চন্দ্র দেব বলেন, বাল্যবিয়ের বিষয়ে আমাদের কেউ জানালে আমরা অভিযান পরিচালনা করে বিয়ে ভেঙে দিই। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরমান হোসেন বলেন, সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলে আমরা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করি। জানতে না পারলে অনেক সময় কিছু করার থাকে না। তবে আমরা বাল্যবিয়ের বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে ব্যবস্থা নেব।