শিক্ষক হত্যা: ছাত্র আটক হলেও প্রভাব খাটিয়ে ছাড়িয়ে নেয় পরিবার

title
২ মাস আগে
শিক্ষক উৎপল কুমার সরকারকে (৩৫) মারধরের পর শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা তাকে আটক করলেও প্রভাব খাটিয়ে ছাড়িয়ে নেয় তার পরিবার। এরপর ছাড়া পেয়ে পালিয়ে যায় ওই ছাত্র। এমনটিই জানা গেছে স্কুল সূত্রে। জানা গেছে, বখাটে ওই ছাত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির মালিক হাজি হযরত আলীর ভাগ্নে উজ্জ্বল হাজির ছেলে। বিজ্ঞাপন সে বিদ্যালয়টির দশম শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র। হামলার পরপর শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা তাকে আটক করলেও প্রভাব খাটিয়ে ছাড়িয়ে নেয় তার পরিবার। এরপর ছাড়া পেয়ে পালিয়ে যায় ওই ছাত্র। গতকাল চিত্রশাইল এলাকায় তাদের বাসায় গিয়ে মা-বাবাসহ কাউকে পাওয়া যায়নি। নিহত উৎপল আশুলিয়ার চিত্রশাইলে হাজী ইউনুছ আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজে শিক্ষকতার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা কমিটির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল করে। শাসন করায় হত্যা! শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কয়েক দিন আগে এক ছাত্রীকে উত্ত্যক্ত করে হাজী ইউনুছ আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজের দশম শ্রেণির এক বখাটে ছাত্র। এরপর ওই ছাত্রকে শাসন করেন উৎপল। এর জের ধরে গত শনিবার দুপুর আড়াইটার দিকে সে শিক্ষকের ওপর হামলা চালায়। সেদিন যা ঘটেছিল ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা জানায়, শনিবার হাজী ইউনুছ আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজের মাঠে ছাত্রীদের ক্রিকেট টুর্নামেন্ট চলছিল। এ সময় মাঠে খেলা পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন উৎপল। দুপুর আড়াইটার দিকে স্কুলের ওই বখাটে ছাত্র সবার সামনে ক্রিকেট স্টাম্প হাতে নিয়ে উৎপলের মাথা ও পেটে বেধড়ক আঘাত করতে থাকে। বিষয়টি বোঝার আগেই রক্তাক্ত হন উৎপল। তাঁকে উদ্ধার করে প্রথমে স্থানীয় নারী ও শিশু কেন্দ্র হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে সাভারের এনাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। পেটে অস্ত্রোপচার করা হয়। ১৬ ব্যাগ রক্ত দেওয়া হয় শরীরে। গতকাল ভোর সাড়ে ৫টার দিকে না-ফেরার দেশে চলে যান উৎপল। হাজী ইউনুছ আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ সাইফুল হাসান বলেন, আমাদের স্কুলে মেয়েদের ক্রিকেট খেলা চলছিল। দুপুরে মাঠের এক পাশে দাঁড়িয়ে থাকা শিক্ষক উৎপলকে হঠাৎ করে এসে ক্রিকেট খেলার স্টাম্প দিয়ে এলোপাতাড়ি আঘাত করতে থাকে ওই ছাত্র। স্টাম্পের আঘাতে শিক্ষকের মাথায় জখম হয়। অধ্যক্ষ বলেন, উৎপল স্যার স্কুলের শৃঙ্খলা কমিটির সভাপতি। তিনি ছাত্রদের বিভিন্ন সময় চুল কাটতে বলাসহ বিভিন্ন আচরণগত সমস্যা নিয়ে কাউন্সেলিং করেন। বিভিন্ন অপরাধের বিচারও করেন তিনি। হয়তো কোনো কারণে সেই শিক্ষকের ওপর ছাত্রটির ক্ষোভ ছিল। হামলার আগে বিদ্যুতের সুইচ বন্ধ নাম প্রকাশ না করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এক কর্মচারী বলেন, হামলার পরে বুঝতে পেরেছি ওই ছাত্র হামলার উদ্দেশ্যে আগেই বিদ্যুতের মেইন সুইচ বন্ধ করে নিয়েছিল, যাতে সিসি ক্যামেরায় এই ভিডিও দেখা না যায়। বিচার চায় স্বজনরা ঘটনার পরই হাসপাতালে ছুটে আসে উৎপল কুমারের ভাই ও স্ত্রী বিউটি রানীসহ স্বজনরা। কিন্তু উৎপল আর ফেরেননি তাদের মধ্যে। কোনোভাবেই এমন মৃত্যু মেনে নিতে পারছে না তারা। দুই বছর আগে বিউটি রানী নন্দীর সঙ্গে পারিবারিকভাবে বিয়ে হয় উৎপল কুমার সরকারের। স্ত্রী সরকারি চাকরি করেন। ঢাকার মিরপুরে স্ত্রীসহ বসবাস করে আসছিলেন উৎপল। আহাজারি ও আক্ষেপ নিয়ে বিউটি রানী বলেন, প্রতিদিনের মতো শনিবার সকালে বাসা থেকে আশুলিয়ায় কলেজে যায় উৎপল। পরে বিকেলে খবর পাই, উৎপলের ওপর হামলা হয়েছে। হাসপাতালে এসে দেখি আমার স্বামীর কোনো জ্ঞান নেই। আইসিইউতে নিথর দেহ পড়ে আছে। হামলাকারী ছাত্রের ফাঁসি চাই। এই হামলার পেছনে আরো কেউ জড়িত থাকলে তাদেরও বিচার চাই। কেন একজন শিক্ষককে এভাবে মারল ছাত্রপ্রশ্ন রাখেন বিউটি রানী। নিহত উৎপলের বড় ভাই অসীত কুমার সরকার বলেন, একজন আদর্শবান শিক্ষককে এভাবে মেরে ফেলল! তাহলে দেশ চলবে কিভাবে? সরকার ও শিক্ষামন্ত্রীর কাছে আকুল আবেদনঘাতকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক। কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা এদিকে ঘটনার পরদিন রবিবার সকালে উৎপল কুমারের ভাই অসীম কুমার সরকার বাদী হয়ে অভিযুক্ত ছাত্রসহ অজ্ঞাতনামা আরো কয়েকজনকে আসামি করে আশুলিয়া থানায় মামলা করেন। উৎপল কুমারের মরদেহ ময়নাতদন্তদের জন্য ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ তাঁর গ্রামের বাড়ি সিরাজগঞ্জে নিয়ে যাবে পরিবার। সেখানেই শেষকৃত্য হওয়ার কথা রয়েছে। এ বিষয়ে ঢাকা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হুমায়ুন কবির বলেন, হামলার শিকার আহত শিক্ষক মারা গেছেন। এ ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে। আসামি বখাটে ছাত্রকে গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। আশা করি দ্রুতই তাকে গ্রেপ্তার করা হবে। সুপার হুমায়ুন কবির বলেন, এমন নির্মম ঘটনা এড়াতে আগামী প্রজন্মকে পারিবারিক শিক্ষা দিতে হবে এবং সমাজের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। সচেতন হতে হবে সবাইকে। গ্রেপ্তার না হলে কঠোর কর্মসূচি শনিবারের হামলার পর হাজী ইউনুছ আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজ বন্ধ ঘোষণা করা হয়। গতকাল শিক্ষক উৎপল কুমার সরকারের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে দুপুরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে জড়ো হয় শত শত শিক্ষার্থী। বিক্ষুব্ধ ছাত্রছাত্রীদের মিছিলে উত্তাল হয়ে ওঠে শিক্ষাঙ্গন। মুহুর্মুহু স্লোগান দেয় তারা। প্রিয় শিক্ষককে হারিয়ে শিক্ষার্থীরা সড়কে অবস্থান নেয়। বখাটে ওই ছাত্র গ্রেপ্তার না হওয়া পর্যন্ত বিক্ষোভ কর্মসূচি চলমান থাকবে বলেও ঘোষণা দেয় শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের এই বিক্ষোভে অংশ নেন শিক্ষকরাও। হাজী ইউনুছ আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রী মুন্নী আক্তার মিম বলে, উৎপল স্যার শৃঙ্খলা কমিটির প্রধান ছিলেন। তিনি বিভিন্ন সময় শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন নিয়ম-শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও ইভ টিজিং বা প্রেমঘটিত বিষয়ে শাসন করতেন। এটা তো স্যারের কাজ। বখাটে চলাফেরার জন্য স্যার ওই ছাত্রকে শাসন করেছিলেন। সেই ক্ষোভ থেকে প্রকাশ্যে স্যারের ওপর হামলা চালিয়েছে। এ সময় তাকে আটক করা হয়েছিল। কিন্তু তার প্রভাবশালী পরিবার তাকে জোর করে নিয়ে যায়। মারধরের পরও সেদিন সন্ধ্যায় দাপট দেখিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে ওই ছাত্রকে ঘুরতে দেখা যায়। আমরা এই হত্যার বিচার চাই। আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ওই ছাত্রকে গ্রেপ্তার করতে না পারলে আমরা কঠোর কর্মসূচিতে যাব। গ্রামের বাড়িতে কাঁদতে কাঁদতে বাকরুদ্ধ মা উল্লাপাড়া (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধি জানান, নিহত প্রভাষক উৎপল কুমার সরকারের গ্রামের বাড়ি সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার লাহিড়ী মোহনপুর ইউনিয়নের এলংজানী গ্রামে। ছোটবেলায় বাবা অজিত সরকারকে হারান। অভাব-অনটনের মধ্যেও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পাস করেন। ২০১৩ সালে হাজী ইউনুছ আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজে প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন উৎপল। উৎপলের মৃত্যুর খবর এলংজানী গ্রামের বাড়িতে পৌঁছলে হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। উৎপলের বৃদ্ধা মা গীতা রানীসহ পরিবারের স্বজন ও প্রতিবেশীদের গগনবিদারী কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে সেখানকার বাতাস। কাঁদতে কাঁদতে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন মা। অকালে সন্তান হারানোর শোক কোনোভাবেই সামাল দিতে পারছেন না তিনি।