পাচার হওয়া মেয়েটির লাশ নিয়েও বাণিজ্য!

title
এক মাস আগে
জন্মের পরই নবজাতককে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের টিক্কাপাড়ার একটি ডাস্টবিনে ফেলে যান মা-বাবা। তবে অলৌকিকভাবে বেঁচে যায় শিশুটি। ডাস্টবিন থেকে শিশুটিকে বুকে তুলে নেন মনির হোসেন নামের এক মাইক্রোবাসচালক। নাম রাখেন সাথি। নিজের মেয়ের মতো আদর-যত্নে সাথিকে বড় করেন মনির। সময় হলে সামর্থ্য অনুসারে বিয়েও দেন। কিন্তু সাথির কপালে সুখ বেশিদিন সয়নি। বিয়ের কয়েক বছরের মধ্যেই এক সন্তানসহ স্বামীর বাড়ি ছাড়তে হয় তাঁকে। এরপর হঠাৎ একদিন নিখোঁজ হয়ে যান সাথি। খোঁজাখুঁজির প্রায় ছয় মাস পর পালক বাবা মনির হোসেন জানতে পারেন সাথিকে সৌদি আরবে পাচার করে দিয়েছে সাগর নামের এক মানবপাচারকারী। এরপর মেয়েকে ফিরে পেতে থানায় অভিযোগ করেও পাননি কোনো সমাধান। তিন বছর পর জানতে পারলেন দেশে ফিরেছেন সাথি। ততদিনে বড্ড দেরি হয়ে গেছে। মনির হোসেন মেয়েকে যখন ফিরে পেলেন তখন তিনি আর বেঁচে নেই। অন্যদিকে মারা যাওয়ার পরও শান্তি মেলেনি সাথির। তাঁর মরদেহ নিয়ে হয়েছে বাণিজ্য। পুরো ঘটনা ধাপাচাপা দিতে মাত্র তিন লাখ টাকায় মানবপাচারকারীর সঙ্গে আপস করতে বাধ্য হয়েছেন পালক বাবা মনির হোসেন। কালের কণ্ঠর অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ৫ সেপ্টেম্বর রাজধানীর আদাবরে আলিফ হাউজিংয়ে সাথির লাশ গোপনে দাফন করতে গিয়ে এলাকাবাসীর হাতে ধরা পড়েন সাগর। এরপর পরিবারের হস্তক্ষেপে রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তাঁর লাশ দাফন করা হয়। আদাবর থানা পুলিশের উপস্থিতিতে স্থানীয় প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপে সাথির জীবনের মূল্য নির্ধারণ করা হয় তিন লাখ টাকা। প্রভাবশালীদের চাপের কারণে থানায় মামলা করতেও সাহস পায়নি সাথির পরিবার। তিন লাখ টাকায় মানবপাচারকারী সাগরের সঙ্গে আপস করতে বাধ্য হন সাথির পালক বাবা। এসংক্রান্ত ভিডিও ফুটেজ কালের কণ্ঠর কাছে রয়েছে। জানা গেছে, আলিফ হাউজিংয়ের একটি বাড়িতে ভাড়া থাকতেন মনির হোসেন। পাশের ফ্ল্যাটে থাকতেন মানবপাচারকারী সাগর ও তাঁর স্ত্রী সোনিয়া। প্রতিবেশী হওয়ায় সাগর ও সোনিয়া জানতে পারেন কাজ খুঁজছেন সাথি। সুযোগ বুঝে প্রলোভন দেখিয়ে গোপনে একদিন সাথিকে সৌদি আরবে পাচার করে দেন এই দম্পতি। হঠাৎ করে সাথির এই নিখোঁজ হয়ে যাওয়া মেনে নিতে পারেনি পরিবার। কিন্তু কিছু করতেও পারছিল না। মনির হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, তিন বছর পর লোকমুখে জানতে পারি অসুস্থ অবস্থায় দেশে ফিরেছে সাথি। কিন্তু মানবপাচারকারী সাগর আমার মেয়েকে লুকিয়ে রাখে। শত অনুরোধেও সাথির প্রকৃত অবস্থা জানতে পারিনি। তিনি বলেন, বিদেশে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের কারণেই সাথির মৃত্যু হয়েছে। বিষয়টি গোপন করতে সাথির অবস্থান আমাদের জানায়নি সাগর। মনির হোসেন আরো জানান, টিক্কাপাড়ায় একটা আবর্জনার ভাগাড়ে সাথিকে কুড়িয়ে পাওয়ার পর দুই দশকের বেশি সময় ধরে মেয়ের আদরে তাঁকে লালন-পালন করে বড় করেছেন তিনি। মনির বলেন, আমার অভাবের সংসারেও মেয়েটিকে বুঝতে দিইনি, এই পৃথিবীতে তার কেউ নেই। বিয়ে দিয়েছিলাম ধুমধাম করে। রাবেয়া নামের তার একটা মেয়েও রয়েছে। কিন্তু সুখ বেশি দিন সইল না। বিয়ের কিছুদিন পরই স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদ হয়ে যায়। অভাবের সংসারে মেয়েকে নিয়ে টিকে থাকতে সাথি নানা জায়গায় কাজ খুঁজে বেড়িয়েছে। এদিকে সাথির লাশ নিয়েও কম কাণ্ড হয়নি। মানবপাচারকারী সাগর ও সোনিয়া দম্পতি একটা সালিস বসান। সেখানে অংশ নেন স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। উপস্থিত ছিলেন পুলিশ সদস্যরাও। সালিসে বিদেশে থাকা অবস্থায় সাথির আনুমানিক একটা আয় নির্ধারণ করা হয়। পরিবারের লোকজনকে সেই টাকা ফেরত দেওয়ার শর্তে আপস-মীমাংসা করতে চাপ দেন প্রভাবশালীরা। শেষে মনির হোসেন তিন লাখ টাকায় আপস রফায় সাথির করুণ মৃত্যুর ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে বাধ্য হন। মনির হোসেন হতাশ কণ্ঠে কালের কণ্ঠকে বলেন, মেয়েটাকে কখনো পর ভাবিনি। কিন্তু এখন আমি নিরুপায়। সাথির মেয়ে রাবেয়ার ভবিষ্যতের কথা ভেবে পাচারকারীদের সঙ্গে তিন লাখ টাকায় আপস করতে বাধ্য হয়েছি। এ ছাড়া আমার আর কোনো পথ ছিল না। অভিযুক্ত মোহাম্মদ সাগর হোসেন বিদেশে লোক পাঠানোর বিষয়টি স্বীকার করে কালের কণ্ঠকে বলেন, দেশে আসার পর থেকে সাথি অসুস্থ ছিলেন। তিনি তাঁর পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে চাননি। তাই আমার কাছেই ছিলেন। অসুস্থ থাকায় তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা করিয়েছি। কিন্তু বাঁচাতে পারিনি। তবে কোন হাসপাতালে সাথির চিকিৎসা করানো হয়েছে সে তথ্য দিতে পারেননি সাগর। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) বিশেষ পুলিশ সুপার সাইদুর রহমান খান বলেন, অবৈধভাবে বিদেশ গমনকারী কিংবা মানবপাচারের শিকার ভুক্তভোগীরা অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীদের সঙ্গে আপস করে ফেলে। তাদের এই অসচেতনতার কারণে ন্যায়বিচার ব্যাহত হয়। এ অবস্থায় অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা যায় না বলে বাধা ছাড়াই তারা তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যায়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের চলতি বছরের জানুয়ারির প্রতিবেদন অনুযায়ী, মানবপাচার দমন আইনে এ পর্যন্ত দেশজুড়ে মানবপাচারসংক্রান্ত চার হাজার ৯৪৫টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ৫৫৪টি মামলার তদন্ত চলছে। এসব মামলায় মোট আসামি ২৪ হাজার ৯১৪ জন। আর মানবপাচারে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার হয় ১০ হাজার ৯৫১ জন। ২০১৯ ও ২০২০ সালে ৫৩টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। এর মধ্যে ১০টি মামলায় ১৭ জন আসামির যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়। ২০২০ সালে ১৪টি মামলা নিষ্পত্তি হয়। এর মধ্যে সাজা হয়েছে একটিতে। এ বিষয়ে জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট সালমা আলী বলেন, নারীরা ভারতসহ মধ্যপ্রাচ্যে পাচার হচ্ছে। স্বামীদ্বারা পরিত্যক্ত অথবা স্বামীরা বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জড়িত বা স্বামী একাধিক বিয়ে করেছে কিন্তু সংসারে উঠিয়ে নেয়নি এ ধরনের মেয়েরা বেশি পাচার হচ্ছে। তিনি বলেন, পাচার হওয়া ভিক্টিমরা সেভাবে আইনের সহায়তাও পাচ্ছে না। সহায়তা না পাওয়ায় আসামিরা অনেক বেশি অর্গানাইজড। আমাদের একটা ভালো আইন আছে, প্ল্যান অব একশন আছে, সাতটা ট্রাইব্যুনাল আছে। এখন আমাদের আইনের প্রয়োগটা নিশ্চিত করা উচিত, সহজ হওয়া উচিত। আবার র্যাব, পুলিশ, সিআইডি এই পাচার নিয়ে কাজ করছে, তাদের মধ্যে সমন্বয় হওয়া উচিত, বিচারিক কার্যক্রম দ্রুত হওয়া প্রয়োজন।