সাইবার অপরাধ বাড়ছেই

title
এক মাস আগে
শিক্ষা বোর্ডের ওয়েবসাইটে তথ্য জালিয়াতি করে জাল সনদ তৈরি কিংবা ব্ল্যাকমেইল করে ধর্ষণ এবং এর ভিডিওচিত্র সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার মতো সাইবার অপরাধ দিন দিন বাড়ছে। আইন করাসহ নানা পদক্ষেপ নেওয়া সত্ত্বেও এমন অপরাধ কমছে না। ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জার, ইনস্টাগ্রাম, স্কাইপে ভুয়া আইডি খুলে জালিয়াতি ও প্রতারণা, বিভিন্ন অনলাইন পোর্টালে মিথ্যা ও মানহানিকর তথ্য প্রচার, আইডি হ্যাক, ডেবিট-ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি, অনলাইনে প্রশ্নপত্র ফাঁস, অনলাইনে জুয়া খেলাসহ অন্তত ১৩ ধরনের সাইবার অপরাধ ঘটছে। সাইবার সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি), তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের সাইবার হেল্প ডেস্ক ও ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারে (এনটিএমসি) সাইবার অপরাধ নিয়ে প্রতিদিনই অভিযোগ জমা পড়ছে। সম্প্রতি পুলিশের মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) নামে, মন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) পরিচয়ে প্রতারণা, নারী পুলিশের আপত্তিকর ছবি ছড়ানো, পাত্রী চাই বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রতারণা, শিক্ষা বোর্ডের তথ্য চুরি, গৃহবধূকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ করে ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া, অনলাইনে জঙ্গিবাদ প্রচার ও জাতীয়সংগীত অবমাননার মতো সাইবার অপরাধের ঘটনায় গ্রেপ্তার হয়েছে অপরাধীরা। এর মধ্যে কিছু ঘটনায় গৃহবধূরা স্বামীর ঘরও ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাইবার সংশ্লিষ্ট তথ্যে জানা গেছে, ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট, পর্নোগ্রাফি আইন, আইসিটি আইন, টেলিকমিউনিকেশন আইনে সারা দেশে ২০১৫ সালে যেখানে ৬৩৮টি মামলা হয়েছে, সেখানে ২০২০ সালে এসে এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৪৫৯টিতে। গত বছরের ডিএমপির সিটি-সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশনের এক পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে, ১৮ বছর বয়সী ছেলেমেয়েদের মধ্যে ৭ শতাংশ, ১৯ থেকে ২৫ বছর বয়সী ছেলেমেয়েদের মধ্যে ৩৪ শতাংশ, ২৬ থেকে ৩৫ বছর বয়সী ছেলেমেয়েদের মধ্যে ৩৬ শতাংশ, ৩৬ থেকে ৫৫ বছর বয়সী নারী-পুরুষের মধ্যে ২০ শতাংশ এবং ৫৫ থেকে বেশি বয়সী নারী-পুরুষের মধ্যে ৩ শতাংশ তথ্য-প্রযুক্তির অপব্যবহার করে অপরাধে জড়াচ্ছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা হয়রানি ও সম্মানের কথা ভেবে এসব বিষয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর কাছে অভিযোগ করে না। সাইবার অপরাধ দমনে সরকার জোরালোভাবে কার্যক্রম শুরু করলেও বিচার ও শাস্তির হার খুবই কম। যার কারণে অনেক ভুক্তভোগী অভিযোগ করে না। এ ছাড়া স্বচ্ছ ধারণা না থাকা ও প্রতিকার পেতে সময়ক্ষেপণ হওয়ায় আইনের আশ্রয় নিতে অনীহা বেশি। ডিএমপির কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের (সিটিটিসি) সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন বিভাগের উপকমিশনার আ ফ ম আল কিবরিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, প্রতিদিন আমাদের কাছে কমপক্ষে ৩০-৪০টি মৌখিক ও লিখিত সাইবার সম্পর্কিত অভিযোগ আসছে। এর মধ্যে ব্ল্যাকমেইলিং, মোবাইল ব্যাকিং ও পর্নোগ্রাফির অভিযোগ বেশি। অভিযোগের ধরন বুঝে ব্যবস্থা নিচ্ছি। এ ছাড়া সবাইকে নিয়মিত প্রযুক্তি ব্যবহারে সতর্কমূলক দিক নির্দেশনা দিচ্ছি। ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার গত ৬ সেপ্টেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে বিটিআরসির সক্ষমতা তুলে ধরে বলেন, বিটিআরসি শুধু ইউটিউব, ফেসবুকের কোনো কনটেন্ট সরানোর অনুরোধ করতে পারে। সেই কনটেন্ট তাদের কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ড পরিপন্থী হলে ফেসবুক কর্তৃপক্ষ তা অপসারণ করে, নয়তো করে না। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী বা সরকারের পক্ষে ইন্টারনেট জগতে কোনো কিছু পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এর আগে আরেক সভায় তিনি বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ সালে প্রণয়ন করা হলেও কিছু সীমাবদ্ধতার কারণে ২০২১ সালে এসেও আইনটি অপরাধ দমনে বিস্তৃত ভূমিকা রাখছে না। আইনের অপপ্রয়োগ মূল সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই অবস্থায় আইনের প্রয়োজনীয় সংশোধন করা সম্ভব। অপরাধ ও সমাজ বিশ্লেষকরা বলছেন, সাইবার অপরাধের মধ্যে নারীদের ফেসবুক ইনবক্সে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য এবং ছবি পাঠানো অন্যতম। বন্ধু তালিকা থেকে বাদ দিয়ে ব্লক করে দিলেও তারা নতুন ফেসবুক আইডি খুলে ফটোশপে কারসাজি করে বানানো আপত্তিকর ছবি দিয়ে হেয় করার চেষ্টা করে। তাই অপরিচিত কাউকে বন্ধু তালিকায় না নেওয়া, কঠিন পাসওয়ার্ড দিয়ে সংরক্ষণে রাখা, কোনো পাসওয়ার্ডই কারো সঙ্গে শেয়ার না করা, সন্দেহজনক লিংকে প্রবেশ না করলে অনেকটা নিরাপদ থাকা যায়। এর পরও কেউ অপরাধের শিকার হলে দ্রুত থানা ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে প্রমাণসহ জানাতে হবে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক শিপ্রা সরকার কালের কণ্ঠকে বলেন, নগরায়ণ, বৈশ্বিক টেকনোলজির ব্যবহার, প্রতিযোগিতা এবং ব্যক্তিগত কারণগুলো কম-বেশি মাত্রায় এই অপরাধের সঙ্গে যুক্ত আছে। অনেকে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া, প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ার মতো বিভিন্ন কারণে হতাশ হয়ে সাইবার অপরাধে জড়াচ্ছে। তিনি বলছেন, প্রযুক্তির ব্যবহার থেকে তো বিরত থাকা যাবে না। তবে প্রযুক্তির অপব্যবহার যেন না হয় সেটা পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয়ভাবে কঠোর নজরদারিতে রাখতে হবে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়েরে ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, সাধারণত সাইবার অপরাধের বেশির ভাগের শিকার নারী। অপরাধীরা এসব নারীকে হয়রানিই করে না, কৌশলে হাতিয়ে নেয় টাকা-পয়সাসহ মূল্যবান জিনিসপত্র। এর অন্যতম একটি কারণ হলোকিছু অযোগ্য ব্যক্তির হাতে উন্নতমানের ডিভাইস থাকা। তাই সাইবার অপরাধের মাত্রা কমিয়ে আনতে দেশের সাইবার অপরাধ দমনের আইন ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কার্যকর ভূমিকা থাকা জরুরি।