সাকিবের ইচ্ছায় বাংলাদেশের আস্থা

title
১০ দিন আগে
আর দশটা দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের ক্রিকেট-সংস্কৃতির বিস্তর পার্থক্য আছে। বাংলাদেশের আর সব ক্রিকেটারের সঙ্গে সাকিব আল হাসানের পার্থক্য তো আরো বেশি। তাই গতকাল নেটে ব্যাটিং করা এই তারকা চট্টগ্রাম টেস্ট খেলার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। চিরায়ত ফিটনেস টেস্ট ছাড়াই আজকে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে প্রথম টেস্টে খেলছেনও কভিড নেগেটিভ হয়ে গত পরশু দলের সঙ্গে যোগ দেওয়া সাকিব আল হাসান। বিজ্ঞাপন অথচ ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ শেষে লম্বা বিরতির পর গতকালই প্রথম অনুশীলন করেছেন সাকিব। আর লাল বলের সঙ্গে তাঁর সর্বশেষ যোগাযোগ সেই গত বছরের ডিসেম্বরে, পাকিস্তানের বিপক্ষে ঢাকা টেস্টে। এমন একজনকে হুট করে টেস্টে নামিয়ে দেওয়ার পক্ষে ক্রিকেট-বিজ্ঞান নয়। বাংলাদেশ দলের হেড কোচ রাসেল ডমিঙ্গোর ২৪ ঘণ্টা আগের কথাবার্তায়ও সেরকম আভাসই ছিল। বরাবরই যেকোনো ফরম্যাটে অটোমেটিক চয়েস সাকিব। তবে লম্বা বিরতির অনভ্যাসের সঙ্গে কভিড আক্রান্ত হওয়ার ধকল সামলে পাঁচ দিনের ক্রিকেটে তাঁকে নামিয়ে দেওয়ার ঝুঁকি নিতে চান না বলেই মনে হয়েছিল ডমিঙ্গোর পরশুর কথাবার্তায়, কভিড শরীর ও মনের ওপর কতটা প্রভাব ফেলে, আমি জানি। তাই সাকিবের ফিটনেস কতটা, সেটা জানার ওপরই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছিলেন তিনি। ৭০ শতাংশ ফিট সাকিবকেও খেলানোটা ঝুঁকিপূর্ণই মনে করেছিলেন ডমিঙ্গো। সেই তিনিই গতকাল নেটে ক্রমাগত থ্রো-ডাউন করিয়েছেন সাকিবকে। নেটে ব্যাটিংয়ের পর তাঁর মনে হয়েছে, ফিটনেসে কোনো সমস্যা নেই। খেলতে চান তিনি। সাকিবের ইচ্ছার কাছে ফিটনেস টেস্টের রুটিন ওয়ার্কে যায়নি বাংলাদেশের টিম ম্যানেজমেন্ট। টিম ডিরেক্টর খালেদ মাহমুদ জানিয়েছেন, কোচের সঙ্গে কথা হয়েছে সাকিবের। সাকিব মনে করছে ও খেলতে পারবে। সাকিব ইচ্ছা প্রকাশ করলে একাদশে রাখতে হবেএমন একটি কথা চট্টগ্রাম টেস্ট শুরুর ৪৮ ঘণ্টা আগে বলেছিলেন খোদ বিসিবি সভাপতি। বাংলাদেশের ক্রিকেট-সংস্কৃতির প্রেক্ষাপটে বোর্ড সভাপতির এমন মন্তব্যের পর ক্রিকেট-বিজ্ঞান অসার। অবশ্য সাকিব নিজেও এমন কত ব্যাকরণ ভুল প্রমাণ করেছেন। নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে সরাসরি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজের গুরুত্ব প্রমাণ করেছেন। অধিনায়ক মমিনুল হক তেমন কিছুরই প্রত্যাশায়, আমার কাছে মনে হয় জিনিসটা (ফিটনেস টেস্ট ছাড়াই সাকিবের খেলা) আপনার চিন্তার ওপর। আমি যদি চিন্তা করি সমস্যা তৈরি হবে না, তাহলে সমস্যা হবে না। দক্ষিণ আফ্রিকায় উনি (সাকিব) খেলতে চেয়েছিলেন। পারিবারিক সমস্যার কারণে খেলতে পারেননি। কভিডের কারণে কিছুটা ঝামেলা হয়েছিল। তা ছাড়া একজন খেলোয়াড়ের ব্যাটিং দেখলে মোটামুটি বোঝা যায়। আমি ব্যাটিং নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। তবু যেটুকু দেখেছি, মনে হয় উনি শতভাগ ফিট, খেলার মতো ফিট। এই ম্যাচ ফিটনেস অবশ্য অনেকটাই অভিজ্ঞতানির্ভর। সাকিবের সেই অভিজ্ঞতা আছে। তাঁকে পেলে মুক্তমনে একাদশ সাজানো যায়। তাই ঝুঁকিটা নিচ্ছে টিম ম্যানেজমেন্ট। তবে হেড কোচের চেয়ে সাকিবের ইচ্ছার প্রতি বেশি আস্থা সম্ভবত বোর্ডকর্তাদের। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা যেমন আক্ষেপ করেই গতকাল বলেছেন, (সাকিবকে) না খেলালে সবাই বলবে বোর্ড খেলতে দিল না। অক্রিকেটীয় যুক্তি, তবে বাংলাদেশ তো! যাক, টেস্ট খেলতে মরিয়া সাকিবকে পেয়ে রোমাঞ্চিত না হলেও ভরসা পাচ্ছে বাংলাদেশ দল। সাকিব ঠিকঠাক নিজেকে ম্যানেজ করতে পারলে ব্যাটে-বলে তাঁর কাছ থেকে পাওয়ার আশায় আছেন মমিনুল। এই নাটকীয় প্রত্যাবর্তনে চট্টগ্রাম টেস্টের দৃশ্যপট থেকে কার্যত হারিয়ে গেছেন মোসাদ্দেক হোসেন। সাকিব নামের আড়ালে একজন করে ব্যাটার ও বোলারকে পায় বাংলাদেশ দল। আবার চট্টগ্রামের পাটা উইকেটে লম্বা সময় ফিল্ডিংয়ের ঝুঁকি থাকে সব সময়। তাই ব্যাটিং ভারী করতে গিয়ে বোলিংয়ে কমতি রাখা বিপজ্জনক। এই চিন্তা থেকে সাতে সাকিবকে খেলিয়ে আরো চার বোলার খেলানোর কথা ভাবছে বাংলাদেশ। চট্টগ্রামে নতুন বল ছাড়া পেসারদের জন্য খুব বেশি কিছু থাকে না। তবে সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স দিয়ে এমন একটা আস্থার জায়গা তৈরি করেছেন পেসাররা যে তাঁদের অবহেলাও করতে পারছে না টিম ম্যানেজমেন্ট। তাই দুই পেসারের সঙ্গে দুই স্পিনারতাইজুল ইসলাম ও নাঈম হাসানকে ফেরানোর সম্ভাবনাই প্রবল। সাকিবের বোলিং সামর্থ্য তো রয়েছেই। এই দল নিয়ে জয়ের আশা করছেন মমিনুল হক, যখন খেলি, জেতার জন্যই খেলি। এখানেও একই পরিকল্পনা নিয়ে খেলব। ম্যাচ জেতার জন্যই খেলব। তবে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে তো বটেই, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক টেস্ট নৈপুণ্য আশাব্যঞ্জক নয়। অধিনায়ক অবশ্য অতীত নিয়ে পড়ে থাকতে রাজি নন, আগে কী হলো না হলো, এগুলো নিয়ে কখনো চিন্তা করি না। যে দল পাঁচ দিন চাপ সামলাতে পারবে, তারাই ম্যাচ জিতবে। অতীত এসবে ভূমিকা রাখে না। শ্রীলঙ্কার অধিনায়ক দিমুথ করুণারত্নের মুখে অতীত ফিরে এসেছে বারবার, বিশেষ করে চট্টগ্রামের উইকেটকে ঘিরে। একেবারে ফ্ল্যাট উইকেট। এখানে হাজার রান আছে। অ্যাঞ্জেলো (ম্যাথুজ) ও আমার মতো সিনিয়র ব্যাটারদের বড় রান করতে হবে। সেই রানের চাপে চিড়েচ্যাপটা হবে বাংলাদেশ দলপ্রত্যাশা লঙ্কান অধিনায়কের। ওদিকে বাংলাদেশ দলের রণ পরিকল্পনায় টস সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাচ্ছে বলেই খবর মিলেছে। টস জিতে ব্যাটিংয়ে নেমে অন্তত সাড়ে পাঁচ শ রান চায় বাংলাদেশ দল। এরপর প্রতিপক্ষ ব্যাটারদের ওপর সাঁড়াশি আক্রমণ করে যদি ফায়দা তুলতে পারেন পাঁচ বোলার। তবে শুরুর মন্ত্র আত্মরক্ষারটস জিতে বড় ইনিংস গড়ে আগে ড্রয়ের ভরসা খুঁজে পাওয়া। জিতলে বোনাস, তবে মমিনুলদের প্রাথমিক মিশন হার এড়ানোর। দলের পাশাপাশি ব্যক্তিগত মিশন তো রয়েছেই। যেমনফিটনেট টেস্ট ছাড়াই সাকিবের মাঠে নেমে পড়ার ঝুঁকিকে যথার্থ প্রমাণ করার চ্যালেঞ্জ। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে হাজার রান করে ফেলা মুশফিকুর রহিমের নিজের নামের প্রতি সুবিচার করার দায়। প্রিয় মাঠ চট্টগ্রামে আবার মমিনুলের চওড়া ব্যাটের দেখা পাওয়ার দাবি আছে। দুই টেস্টের ক্যারিয়ারেই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ দেখে ফেলা মাহমুদুল হাসানকে ঘিরেও গভীর পর্যবেক্ষণ হবে। আর চট্টগ্রামের উইকেট তো বোলারদের জন্য বরাবরের চ্যালেঞ্জ। অবশ্য টেস্ট ক্রিকেট নামের সঙ্গেই জুড়ে পরীক্ষা, বাংলাদেশের জন্য যা সব সময় অগ্নিপরীক্ষা।