বাংলাদেশকে উল্টো পথে টানতে চায় কারা

title
১০ দিন আগে
পদ্মা-মেঘনা বিধৌত এই গাঙ্গেয় বদ্বীপ বাংলাদেশ এক অদ্ভুত দেশ। ত্রিশের দশকে একদল যুবক পণ করলেন লড়াই করে ইংরেজদের হাত থেকে দেশকে স্বাধীন করতে হবে। নেতৃত্ব দিতে এগিয়ে এলেন চট্টগ্রামের একজন স্কুল শিক্ষক সূর্য কুমার সেন। সবার কাছে মাস্টারদা। বিজ্ঞাপন গড়ে তুললেন যুবকদের নিয়ে এক সশস্ত্র বাহিনী। সেই অসম যুদ্ধে পরাজিত হয়ে ফাঁসিতে ঝুললেন মাস্টারদা আর তাঁর সঙ্গীরা। কয়েকজন প্রাণ দিলেন সম্মুখ সমরে। এর অনেক দিন পর আরেকজন বাঙালি শেখ মুজিবুর রহমান, যিনি হয়ে উঠেছিলেন বাংলার বন্ধু, বঙ্গবন্ধু। পণ করেছিলেনএবার দেশকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ। বলেছিলেন, আমজনতার সামনে দাঁড়িয়ে এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। তাঁর আহ্বানে সাত কোটি বাঙালি দেশকে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর হাত থেকে উদ্ধার করতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। সেই অসম ৯ মাসের লড়াইয়ে দেশমাতৃকার জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন ৩০ লাখ মানুষ। স্বাধীন করেছিলেন স্বদেশভূমি বাংলাদেশ। আবার সেই মানুষটিকে, শেখ মুজিবকে নির্মমভাবে হত্যা করেছিলেন তাঁরই খুব কাছের কিছু মানুষ, স্রেফ ক্ষমতার লোভে। পরবর্তী সময়ে সেই মানুষগুলো মাঝেমধ্যে পেছনের দরজা দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন। প্রতিবারই ৩০ লাখ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশকে আবার পাকিস্তান বানাতে ছেয়েছিলেন। আবার যখন জনগণের দ্বারা তাঁরা বিতাড়িত হয়েছেন, তাঁরা পাগলের প্রলাপ বকতে শুরু করেছেন। সঙ্গে পেয়েছেন কিছু নষ্ট বুদ্ধিজীবী। ডুবন্ত মানুষের মতো আঁকড়ে ধরতে চেয়েছেন খড়কুটো। নানা ধরনের ষড়যন্ত্র করেছেন। পিতার মতো কন্যা শেখ হাসিনাকেও হত্যা করতে চেয়েছেন বারবার। ব্যর্থ হয়ে ধরনা দিয়েছেন বিদেশিদের দ্বারে। ভুলে গেছেন ভাড়াটে কুকুর কোনো কাজে আসে না। সেই মহলটি গত ১৩ বছর ক্ষমতার বাইরে। সেই মহলকে যে দলটি নেতৃত্ব দেয় তার শীর্ষস্থানীয় দুই নেতাই দুর্নীতি, মানি লন্ডারিং আর অস্ত্র মামলায় সাজাপ্রাপ্ত। একজন বিদেশে পলাতক। এমন যখন তাঁদের অবস্থা, তখন তাঁরা স্বপ্ন দেখেন আবার ক্ষমতায় ফেরার। হুংকার দেন শেখ হাসিনার সরকারের মেয়াদ আর দুই বছর। একজন আবিষ্কার করলেন শেখ হাসিনার দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এখন অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে। পরিস্থিতি যখন এই, তখন মাঝেমধ্যে ভিন দেশে কিছু ঘটনা ঘটে, যা তাদের জন্য মৃতসঞ্জীবনী সুধার মতো কাজ করে। নির্বাচন হলো দিল্লির মসনদের জন্য। কংগ্রেসকে হারিয়ে দিল্লির মসনদে গেল বিজেপি। ধন্য ধন্য পড়ে গেল বাংলাদেশে। এবার তো আওয়ামী লীগের মিত্র কংগ্রেসের ভরাডুবি। এর পরের পালা আওয়ামী লীগের। বিভিন্ন জায়গার মিষ্টির অর্ডারে ময়রা জেরবার। দরজি অনেক দিন কাজ পায় না। সাফারির অর্ডার ফিরল আবার দরজির দোকানে। লাভ হলো না। নরেন্দ্র মোদি যোগাযোগ করলেন শেখ হাসিনার সঙ্গে। বাংলাদেশে ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্নে বিভোর মহল হতাশ। দিল্লি যে এমন করবে তা তারা আগে ভাবেনি। যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্রদের দীর্ঘ দখলে থাকার পর পতন হলো বাদশাহ আমানউল্লাহ খানের কাবুলের। বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের আধুনিকতম সেনাবাহিনী তাদের সব অস্ত্র, গোলাবারুদ ও যুদ্ধবিমান ফেলে রাতের আঁধারে পালাল আফগানিস্তান থেকে। এমন অপমানজনক পলায়ন ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর আর হয়নি। বিজয়ীর বেশে কাবুলে প্রবেশ করল খালি পায়ে জোব্বা আর মাথায় ১০ হাত লম্বা পাগড়ি পরে তালেবান যোদ্ধারা। তার রেশ পড়ল বাংলাদেশে। ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য পাগল মহলটির ঘরে ঘরে ঈদের আনন্দ। তাদের থলের বুদ্ধিজীবীরা আনন্দে আত্মহারা। কেউ কেউ কিশমিশ-খেজুর খাওয়া শুরু করে দিল। কিছুদিনের মধ্যেই স্বপ্নভঙ্গ। সরকার এই করোনা মহামারিকালে বেশ ঘটা করে পালন করল জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী। শুভেচ্ছা জানাতে এলেন সার্কভুক্ত রাষ্ট্রপ্রধানরা। বাদ পড়ল পাকিস্তান আর আফগানিস্তান। যখন সব কিছু বিফল, হঠাৎ করে সামনে এলো শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক বিপর্যয়। দেশটির রাজকোষ খালি। সেই দেশের সরকার হাত পাতল শেখ হাসিনার কাছে। বিপদে বন্ধুর কাজে আসা পুণ্যের কাজ। খালি হাতে তো আর ফেরানো যায় না। বাংলাদেশের রাজকোষ থেকে শ্রীলঙ্কাকে শেখ হাসিনা সহজ শর্তে দিলেন ২০০ মিলিয়ন ডলার। খুব বেশি সুবিধা করতে পারল না শ্রীলঙ্কা। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের জন্য হাহাকার। দাবি উঠল সরকারের পদত্যাগের। রাস্তায় জ্বলল গাড়ি। উন্মত্ত জনতা আগুন দিল সরকারি ভবনে। লঙ্কায় আবার লঙ্কা কাণ্ড। ধার করে ঘি খেতে গেলে পরিস্থিতি নাজুক হতে পারে। আর সেই ঘি যদি চীনের হয়, তাহলে বিপদ একটু বেশি। বাংলাদেশে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য বিভোর মহলটির ঘরে আবারও আলোর ঝলকানি। এবার বাংলাদেশ হতে যাচ্ছে আরেক শ্রীলঙ্কা। চীন থেকে বিভিন্ন প্রকল্পে বাংলাদেশের ঋণ আছে না? সেই ঋণ ফেরত দেওয়ার মুরদ তো শেখ হাসিনার নেই। রাতের টিভিতে এসে কেউ কেউ গলা ফাটিয়ে ফেললেন। সবাই চিন্তিত, সামনে বাংলাদেশের মানুষ শ্রীলঙ্কার মানুষের অবস্থায় পড়লে তাদের কী অবস্থা হবে সেই ভাবনায়। বাংলাদেশের এক শ্রেণির মানুষ অন্য দেশের মানুষের দুর্যোগ ও বিপদ দেখে আনন্দিত হয়। ভাবে, একই ঘটনা বাংলাদেশেও ঘটতে যাচ্ছে। তারা বোঝে না বাংলাদেশের অবস্থা শ্রীলঙ্কার মতো কখনো ছিল না, আর হবেও না। শ্রীলঙ্কা দেশটির মোট জনসংখ্যা দুই কোটি, আমাদের ঢাকা শহরেরও কম। অর্থনীতি পর্যটননির্ভর। সাধারণ সময়ে বছরে ২৩ থেকে ২৪ লাখ পর্যটক দেশটি সফর করে অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখেন। জিডিপির ১২ থেকে ১৩ শতাংশ আসে এই খাত থেকে। এর মধ্যে ২০১৯ সালে তিনটি গির্জায় আর তিনটি হোটেলে ফাটল আত্মঘাতী বোমা। মারা পড়ল ২৯০ জন মানুষ, যার মধ্যে ৪৫ জন বিদেশি পর্যটক। এরপর কি আর পর্যটক শ্রীলঙ্কামুখী হয়? ঘাতকরা সবাই ছিল একটি ইসলামী সন্ত্রাসী দলের সদস্য। এতে রাষ্ট্রীয় খড়্গ পড়ল স্থানীয় মুসলমানদের ওপর। পুড়ল তাদের ঘরবাড়ি-দোকানপাট। মাঠে নামল অন্য আরেকটি বুদ্ধিস্ট মৌলবাদী জঙ্গি সংগঠন। লাগল ভয়াবহ দাঙ্গা। একটি দেশের সামাজিক পরিবেশ ধ্বংস করতে আর কী লাগে? জন্ম হলো উগ্র সিনহালা জাতীয়তাবাদের। নিরাপত্তা উবে গেল অন্য সব ধর্মের মানুষের। খ্রিস্টানরাও বাদ গেল না। ২০০৯ সালে বিচ্ছিন্নতাবাদী তামিল টাইগাররা উত্খাত হয়ে গেছে। জাতীয় নির্বাচনের আগে দেশটির প্রেসিডেন্ট রাজাপক্ষে জনগণের কাছে প্রিয় হওয়ার জন্য ঘোষণা করলেন নির্বাচনে বিজয়ী হলে তিনি দেশের মূল্য সংযোজন কর অর্ধেক করে দেবেন। জিতে তিনি নিজের কথা রাখলেন। এর মধ্যে এমনি তো পর্যটকরা শ্রীলঙ্কাবিমুখ হয়ে পড়েছেন, তার ওপর অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণও অর্ধেকে নেমে এলো। গোদের ওপর বিষফোড়া হয়ে দেখা দিল চীনের কাছ থেকে নেওয়া ঋণের বোঝা। ২০২১ সালে এই ঋণ দাঁড়াল জিডিপির ১১৯ শতাংশ। বাংলাদেশের এই ঋণের পরিমাণ এর জিডিপির ৪৫ শতাংশ আর চীন থেকে নেওয়া ঋণ মোট ঋণের মাত্র ৫ শতাংশ। বাংলাদেশের সব ঋণই সহজ শর্তে নেওয়া। বাংলাদেশের ক্রেডিট রেটিং ভালো এবং এই দেশটি কখনো ঋণখেলাপি হয়নি। এখনো বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় উন্নয়ন সহযোগী জাপান। বাংলাদেশ প্রয়োজনে ঋণ সহায়তা ছাড়াও যে বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারে তার বড় প্রমাণ পদ্মা সেতু। বাংলাদেশের মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ ২৯২ ডলার আর দেউলিয়া হওয়া শ্রীলঙ্কার তা এক হাজার ৬৫০ ডলার। এই করোনাকালে বাংলাদেশের বৈদেশিক রিজার্ভের পরিমাণ ৪৫ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। আর শ্রীলঙ্কার সিন্দুকে হাত দিলে দুই বিলিয়ন ডলারের বেশি পাওয়া যায় না। বিদেশে কর্মরতরা বছরে দেশে পাঠান ২৪ থেকে ২৫ বিলিয়ন ডলার, যার পরিমাণ শ্রীলঙ্কার আট বিলিয়ন ডলারের কম। বর্তমানে তার পরিমাণ আরো কমছে। অশান্তির দেশে কে আর অর্থ পাঠাতে চায়? এদিকে চীন দাবি করল ঋণের টাকা আর সুদ। শ্রীলঙ্কার বন্দরে উঠল চীনের ঝাণ্ডা। রাজাপক্ষে সিদ্ধান্ত নিলেন কৃষিতে আমদানি করা রাসায়নিক সারের বদলে জৈবিক সার ব্যবহার করবেন। তাতে বছরে বেঁচে যাবে ৪০০ মিলিয়ন ডলার। ভালো সিদ্ধান্ত; কিন্তু সময়টা সঠিক ছিল না আর কৃষকরা এর জন্য প্রস্তুত নয়। মুখ থুবড়ে পড়ল এই উদ্যোগ আর দেশটির কৃষি অর্থনীতি। বিপদ যখন আসে তখন তা একসঙ্গে আসে। বিশ্ব যখন মহামারিতে জেরবার, বিশ্বের দেশে দেশে যখন অর্থনীতিতে ধ্বংস নামছে, তখনো বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশ ছিল। এই সময়ে বিশ্বের মাত্র ২৩টি দেশে প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক ছিল। বর্তমানে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় নিয়মিত বাড়ছে। এই বছর বাংলাদেশের রপ্তানি টার্গেট ১০ মাসেই অর্জিত হয়েছে। চীন, ভিয়েতনাম, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা থেকে বিদেশি বিনিয়োগ বাংলাদেশে আসছে। দেশে ১০০ রপ্তানি প্রক্রিয়াজাত অঞ্চল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বৃদ্ধি হচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা। এসবের প্রেক্ষাপটে কারা কোন উদ্দেশ্যে বাংলাদেশের সঙ্গে শ্রীলঙ্কার তুলনা করেন? তবে হ্যাঁ, বাংলাদেশকে নিজের স্বার্থে একটু সতর্ক হতে হবে। এই মুহূর্তে প্রয়োজন নেই এমন প্রকল্পের চিন্তা আপাতত বাদ করতে হবে। দেশ এখন আমলাতন্ত্রের খপ্পরে। আমলা প্রয়োজন, সঙ্গে তন্ত্র নয়। আর এক শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তা আর রাজনীতিবিদের লাগামহীন দুর্নীতি আর দেশ থেকে অর্থপাচারএইটুকু রোধ করতে পারলে আপাতত বাংলাদেশের শ্রীলঙ্কা হওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই। লেখক : বিশ্লেষক ও গবেষক