হঠাৎ বন্যায় অসহায় সিলেট

title
২ মাস আগে
বিছনাকান্দির পর গত কয়েক বছর ধরে সিলেটের ভোলাগঞ্জের সাদাপাথর হয়ে উঠেছে বাংলাদেশি ভ্রমণ পিপাসুদের আরেক জনপ্রিয় গন্তব্য৷ ধলাই নদীর বাংলাদেশ উৎসে সাদাপাথর আর জলের খেলায় মেতে অনেক পর্যটক মেঘালয়ের সৌন্দর্য দেখে সীমান্তে দাঁড়িয়ে আফসোসও করেন৷ কিন্তু কজন খবর রাখেন,এবার সিলেটে হঠাৎ বন্যার যে পানি হানা দিয়েছে, তার বড় একটা অংশ মেঘালয়ের পাহাড় থেকে নেমে এসেছে এই অগভীর ধলাই নদ দিয়েই৷ কারণ সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার এই ভোলাগঞ্জ থেকে সোজা উত্তরের পাহাড়ে পৃথিবীর সবেচেয়ে বৃষ্টিপাতপ্রবণ এলাকা চেরাপুঞ্জি৷ ভারতীয় আবহাওয়া বিভাগ গত ১৬ জুন এই চেরাপুঞ্জিতে ৯৭ সেন্টিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে৷ যা দেশটির আবহাওয়া বিভাগের কাছে থাকা ১২২ বছরের রেকর্ডে তৃতীয় সর্বোচ্চ৷ তথ্য উপাত্ত বলছে,সর্বোচ্চ ১৫৬ দশমিক ৩ সেন্টিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছিল ১৯৯৫ সালে৷ এবারের ১৬ জুনের আগে-পরেও ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে মেঘালয় ও আসামে৷ সেই পানি নেমে এসে ভাসিয়ে দিয়েছে বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলকে৷ এরমাঝেই বাংলাদেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা: মো: এনামুর রহমান বলেন, সিলেটের এই বন্যা ১২২ বছরের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যা৷ পরিবেশ বিজ্ঞানী ও পানি সম্পদ বিশেষজ্ঞ,যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভেনিয়ার লক হ্যাভেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান ডয়চে ভেলেকে বলেছেন, ১২২ বছরে এবার তৃতীয় সর্বোচ্চ বৃষ্টি হয়েছে৷ সর্বোচ্চ না৷ কিন্তু এবারের বন্যাটা এত তীব্র কেন-সেটা হচ্ছে মূল কথা৷ মেঘালয় থেকে আসা আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোকে আমরা সেভাবে আমলে নিচ্ছি না: আব্দুল হাই আল হাদী ‘তীব্র বন্যার যত কারণ’ ড. খালেকুজ্জামানেরমতে,আগের দুইবারের তুলনায় কম বৃষ্টিপাত হলেও দীর্ঘদিন ধরে ভূমি ব্যবহার বদলে যাওয়ায় এবার বেশি বন্যা হচ্ছে৷ তিনি বলেন,আমাদের হাওরের নদীনালা খালবিলগুলো অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে৷ নদীবক্ষ ভরাট হয়ে গেছে৷ ‘‘সিলেটের সুরমা নদীর কথাই যদি ধরি, সেটার তলদেশ এখন ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে৷ ময়লা আবর্জনা, সিলেটে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা তেমনভাবে নেই৷ সিলেট শহরের ছড়া ও নালা-নর্দমা, সুয়ারেজ সিস্টেমও অনেকটা অকেজো হয়ে পড়েছে৷ তাই এখন আগের সমপরিমাণ বৃষ্টি হলেও বন্যার তীব্রতা অনেক বেড়ে যায়৷” অবশ্য সিলেটে সারি নদী বাঁচাও আন্দোলনের সভাপতি আব্দুল হাই আল হাদী এই আলোচনায় দৃষ্টান্ত হিসাবেও সুরমাকে শুরুতেই সামনে আনতে নারাজ৷ তার মতে, সুরমা-কুশিয়ারার দেশের গুরুত্বপূর্ণ নদী হলেও এই বন্যাকে বুঝতে হলে দৃষ্টি দিতে হবে অন্য নদীগুলোর দিকে৷ সিলেটের পূর্ব সীমান্ত দিয়ে আসাম থেকে এই দুই নদী বাংলাদেশে এসেছে৷ এর মাঝে সুরমা এসেছে জকিগঞ্জ দিয়ে৷ হাদীর মতে, এই জকিগঞ্জের পর থেকে কানাইঘাট, জৈন্তাপুর, গোয়াইনঘাট, কোম্পানিগঞ্জ; সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার,ছাতক,তাহিরপুর; এমনকি নেত্রকোণা পর্যন্ত মেঘনা বেসিন৷ এই বেসিনের প্রায় ৫০টার মত নদী মেঘালয় থেকে এসেছে৷ তার অভিযোগ, মেঘালয় থেকে আসা আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোকে আমরা সেভাবে আমলে নিচ্ছি না৷ সুরমা-কুশিয়ারা নিয়েই আছি৷ অথচ এই নদীগুলোর চরিত্র সম্পূর্ণ আলাদা৷ পাহাড়ে রাতে বৃষ্টি হলে সকাল হতে না হতে হঠাৎ বন্যার পানিতে এখানকার জনপদ-সম্পদ-জীবন সবকিছু উলটপালট হয়ে যায়৷ তিনি বলেন, আড়াআড়িভাবে সোজা উপর থেকে নিচে পড়ার কারণে এগুলোর পানির বেগ থাকে প্রচণ্ড৷ এ কারণে জানমালের বিশাল ক্ষতি হয়৷ সিলেট অঞ্চলের নদী রক্ষা আন্দোলনের এই সংগঠক বলছেন, এই নদীগুলোর কোনটাই ঠিক অবস্থায় নাই৷ এগুলো দিয়ে প্রচুর পাথর ও বালি আসে৷ মানুষজন এগুলোকে ক্ষতবিক্ষত করে ফেলেছে৷ প্রায় নদীই ভরাট হয়ে গেছে৷ অনেকগুলো নদী প্রায় বিলীনের পথে৷ তার মতে, দ্বিতীয় কারণ নদীর প্লাবনভূমি না থাকা৷ তিনি বলেন,ফ্লাশ ফ্লাডের সময় এ সব প্লাবনভূমিতে পানি জমা হতো৷ অনেক নদীর সেই প্লাবন ভূমি এখন আর নেই৷ পানির প্রবাহ নষ্ট করা অবকাঠামো সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন,এখানের প্রধান সড়ক যদি ধরেন৷ সিলেট-শিলং রোড ১৯২০ সালে ব্রিটিশরা করেছিল৷ উত্তর-পূর্ব অংশের পানি এখানে বাধাগ্রস্ত হয়৷ সিলেট-ভোলাগঞ্জ রোড৷ এটা অনেক উঁচু একটা রোড৷ এবার কোমর সমান পানি এই রাস্তার উপর দিয়ে গেছে৷ছাতক দোয়ারাবাজারে অনেক রোড হচ্ছে৷ নেত্রকোণার অলওয়েদার রোড৷ পানিবন্দি সিলেট শহর বিদ্যুৎ নেই সিলেট শহরের কালীঘাট এলাকার একাধিক ব্যবসায়ী এবং স্থানীয় বাসিন্দা জানান, গত চার-পাঁচ দিন যাবত বন্যার কারণে তাদের এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। এতে তাদের সীমাহীন ভোগান্তি হচ্ছে। বিদ্যুৎ সরবরাহ কবে নাগাদ আবার শুরু হবে তা নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না সংশ্লিষ্টদের কেউ। পানিবন্দি সিলেট শহর বসতবাড়ি এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে পানি শহরের কালীঘাট, উপশহরসহ একাধিক স্থানে ঘুরে দেখা যায়, সেখানে আবাসিক এলাকা এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হাঁটু সমান বা কোথাও তার চেয়েও বেশি পানি। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো গত রোববার পর্যন্ত বন্ধ ছিল, সোমবার থেকে পানি কিছুটা নেমে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরা দোকানপাট খুলতে শুরু করেছেন৷ পানিবন্দি সিলেট শহর নদী আর সমতল মিশে একাকার সিলেটের সুরমা নদীর পাশেই লালদিঘীরপাড় বাজার এলাকা। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, নদীর সাথে সমতলের কোনো পার্থক্য নেই। দুই জায়গারই পানির উচ্চতা এক। নদীর কাছাকাছি গিয়ে দেখা যায়, সেখানে লাল কাপড় দিয়ে নদীর সীমানা চিহ্নিত করা হয়েছে যেন কোনো ধরনের দুর্ঘটনা না ঘটে। পানিবন্দি সিলেট শহর গবাদি পশুও সংকটে সিলেট নগরীর ছড়ারপাড় এলাকার বাসিন্দা পেশায় ঠিকাদার মো. তপু গনি জানান, তিনি শখের বশে বসতবাড়িতে ছাগল ও ভেড়া পালেন ১০-১২টি। এবারের বন্যায় দুই ঘন্টার মধ্যে পানি কোমর পর্যন্ত হয়ে যাওয়ায় কিছু টের পাওয়ার আগেই তার চারটা ভেড়া মারা যায়। এতে তার প্রায় দুই লাখ টাকা ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি তার। বাকি ছাগলগুলো বাসার দোতলায় নির্মানাধীন একটি ঘরে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। পানিবন্দি সিলেট শহর প্রতিবেশীদের আশ্রয় দিলেন বাড়ির মালিক সিলেট শহরের কালীঘাট সংলগ্ন কামালগড়ের তিনতলা বাড়ির মালিক নজরুল ইসলাম। প্রতিবেীদের ঘরে বন্যার পানি প্রবেশ করায় তিনি তার বাড়িটি প্রতিবেশীদের জন্য ছেড়ে দিয়ে সপরিবারে ঢাকায় মেয়ের বাসায় চলে গেছেন। তার তিনতলা বাড়িতে এখন ছয়টি পরিবার বাস করছে। পানিবন্দি সিলেট শহর ঘরছাড়া এক মাস স্থানীয় বাসাবাড়িতে রান্নার কাজ করেন মাছিতপুর এলাকার বাসিন্দা জয়ফুন্নেসা বেগম। তিনি জানান, গত মাসে যখন বন্যা হলো, তখন থেকেই তার ঘরের ছাদ সমান পানি উঠেছে। প্রায় এক মাস যাবত তার ঘরে পানি। আশ্রয় নিয়েছেন পার্শ্ববর্তী এক চারতলা বাসায়। পানিবন্দি সিলেট শহর মৃতদেহ বহনে সমস্যা সিলেট শহরের কামালগড়ের বাসিন্দা ৮০ বছরের হায়াত আলী বার্ধক্যজনিত কারণে মারা গেছেন সোমবার। মরদেহ নিয়ে যাওয়া হচ্ছে কুষ্টিয়ার গ্রামের বাড়িতে । শহরে বুক সমান পানি থাকায় মৃতের বাসা পর্যন্ত অ্যাম্বুলেন্স যেতে না পারেনি৷ তাই প্রধান সড়ক পর্যন্ত কাঁধে করে লাশ নিয়ে আসতে হয়। পানিবন্দি সিলেট শহর সরকারি প্রতিষ্ঠান যেভাবে চলছে সিলেট শহরের তালতলা এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ কোম্পানি লিমিটেড (বিটিসিএল) অফিসে হাঁটু সমান পানি। দুদিন আগে সেখানে কোমর সমান পানি থাকলেও গতকাল থেকে পানি নামছে। এদিকে চার দিন ধরে বিদ্যুৎ না থাকায় কখনো জেনারেটর আবার কখনো প্রায় অন্ধকারেই সাধারণ মানুষকে সেবা দিতে হচ্ছে বলে জানান নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা। পানিবন্দি সিলেট শহর খাবার পানির সংকট সিলেটের তালতলা এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, মন্নুজান বেগম নামের একজন কলস নিয়ে পানি আনতে যাচ্ছেন স্থানীয় সরকারি পানির পাম্পে। তিনি জানান, যে বস্তিতে থাকেন, সেখানকার টিউবওয়েল বন্যার পানিতে ডুবে গেছে। তাই প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে এসে তাকে খাবার পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। পানিবন্দি সিলেট শহর পানিতে বিকল যানবাহন সিলেটের তালতলা, কালীঘাটসহ পানিতে ডুবে থাকা বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, যানবাহনে পানি ঢুকে যাওয়ায় সেগুলো অকেজো হয়ে পড়ছে। অনেকে পানির গভীরতা অনুমান করতে না পেরে বেশি পানিতে গিয়ে বিকল বাহন নিয়ে বিপদে পড়ছেন। পানিবন্দি সিলেট শহর শহর পানিতে থৈ থৈ উপশহর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সেখানে রাস্তায় হাঁটু সমান পানি। দুইদিন পানির উচ্চতা কোমর সমান ছিল বলে জানান স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। এইসব রাস্তায় এত পানি গত ২২ বছরে কখনো দেখেননি বলে জানান আড়ত ব্যবসায়ী আলী আহাম্মদ। পানিবন্দি সিলেট শহর পোষা প্রাণী নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে আব্দুল জব্বার পেশায় নিরাপত্তাকর্মী, থাকেন উপশহর এলাকায়। এবারের বন্যায় তার বসতবাড়িতে কোমর সমান পানি হওয়ায় তিনি একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের দুইতলায় আশ্রয় নিয়েছেন। নীচে যেহেতু সব জায়গায় পানি, তাই সাথে নিয়ে এসেছেন তার পোষা কুকুরটিকেও। পানিবন্দি সিলেট শহর ভেলা বানিয়ে চলাচল সিলেটের তালতলা এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সেখানে খাল এবং রাস্তার পানির উচ্চতা এক। স্থানীয় শিশু -কিশোরেরা কলাগাছের ভেলা এবং ককশিট দিয়ে তৈরি নৌকা দিয়ে খেলার ছলে রাস্তা পার হচ্ছে। তবে এতে দুই-তিনজনের বেশি চড়া যাচ্ছে না বলে জানায় আশরাফ ও মেহেদি নামের এই দুই শিশু। পানিবন্দি সিলেট শহর সড়কে মাছের আশায় জাল ফেলা শহরের তালতলা এলাকায় খালের পানি স্বাভাবিক উচ্চতার চেয়ে প্রায় পাঁচ-ছয় ফুট উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে রাস্তায়ও পানি হাঁটু সমান। সেখানে জাল ফেলে মাছ ধরতে এসেছেন আবু জাফর নামের এক জেলে। তিনি জানান, বড় মাছ না পাওয়া গেলেও যদি সামান্য কিছু ছোট মাছ পাওয়া যায় সে আশায় গতকাল এবং আজ জাল ফেলেছন তিনি। তবে এখনো কোনো মাছ পাননি। পানিবন্দি সিলেট শহর পানি কমছে গত দুই দিন ধরে সিলেট শহরে বৃষ্টিপাত কিছুটা কম হওয়ায় বিভিন্ন এলাকার পানি ধীরে ধীরে কমছে৷ হুট করে যেভাবে পানি বেড়ে গিয়েছিল, সেভাবে কমছে না। কারণ জানতে চাইলে একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, পানি নামার মতো জলাশয় নেই, যা টুকটাক ছিল, মানুষ ভরাট করে ফেলেছে। এই বন্যার পানি নামতে কমপক্ষে আরো পাঁচ-ছয় দিন লাগবে বলেও ধারণা করছেন তারা। লেখক: মর্তূজা রাশেদ (সিলেট থেকে) ‘হাওরে বন্যা-বাঁধ-অলওয়েদার সড়কের দায়’ কিশোরগঞ্জের ইটনা,মিঠামইন ও অষ্টগ্রামকে যুক্ত করে নির্মিত হয়েছে অলওয়েদার সড়ক৷ এর নির্মাণে যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন করা হয়নি বলে মনে করেন লক হ্যাভেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড.মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান৷ নির্মাণের আগে এটির অন্তত ৩০ ভাগ এলিভেটেড করারও পরামর্শ দিয়েছিলেন তিনি৷ কিন্তু তার সেই পরামর্শে কর্ণপাত করেনি কর্তৃপক্ষ৷ তবে সম্প্রতি হাওরের সব সড়ক এলিভেটেড করতে মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তকে নিজের সেই অবস্থানের বিজয় হিসাবেই দেখছেন তিনি৷ সিলেটের বন্যায় এই অলওয়েদার সড়কের দায় সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন,সিলেট ও সুনামগঞ্জ থেকে অষ্টগ্রাম, ইটনা ও মিঠামইনের সড়ক অনেক ভাটিতে৷ তাই এই বন্যার সাথে এই সড়কের খুব একটা সম্পর্ক নেই৷ ‘‘তবে বন্যা যখন আস্তে আস্তে কিশোরগঞ্জে নেমে আসবে,তখনএই সড়ক স্বাভাবিক পানি চলাচলে কিছুটা বাধা দিতে পারে৷ তখন ওই রাস্তার একদিকে বন্যার তীব্রতা কিছুটা বেশি হতে পারে৷” এখনকার বন্যায় ভূমিকা না থাকলেও হাওরের পরিবেশে এই সড়কের দায় আছে বলে মনে করেন তিনি৷ এটা বোঝাতে তিনি হাওর বোঝার উপর গুরুত্ব দেন৷ তার মতে,বৃহত্তর সিলেট ও ময়মনসিংহ অঞ্চলে প্রায় ৩৭৩টা হাওর রয়েছে৷ বর্ষাকালে এগুলো একটার সাথ আরেকটা সংযুক্ত হয়ে মিঠাপানির সাগরে পরিণত হয়৷ সাগর থেকেই অপভ্রংশ হাওর৷এটা প্রকৃতির অন্যন্য সাধারণ একটা উপাদান৷ ‘‘এটা প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হয়েছে৷ এর বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে,পানির অবাধ চলাচল৷ মাছের অবাধ চলাচল৷ কৃষক-মাঝি-জেলেরাও যেন বর্ষাকালে হাওরের যে কোন জায়গায় যাতায়াত করতে পারে৷” ‘‘এখন আপনি যদি হঠাৎ করে একটা অলওয়েদার রাস্তা করে ফেলেন৷ তাহলেতো সেই বৈশিষ্ট্যটা অক্ষুন্ন থাকছে না৷ এটাকে নষ্ট করে ফেলছেন৷ কারণ পানির অবাধ চলাচল থাকছে না৷ মাছের অবাধ বিচরণক্ষেত্র থাকছে না৷ মাঝি-জেলে যেতে পারছে না৷ "কিন্তু এখানে ৩০-৩৫ শতাংশ উড়াল সেতু করা হলে পানির অবাধ চলাচল থাকতো৷” তিনি বলেন,এই সড়কের পশ্চিম পাশে ধনু,পূর্বপাশে কালনী নদী৷ একটা নদীতে বেশি পানি হলে সেটা গড়িয়ে অন্য নদীতে যেতে পারতো৷ এক প্রশ্নের জবাবে ফসল রক্ষা বাঁধ নিয়ে কথা বলেন তিনি৷ তার মতে,এ সব বাঁধ দিয়ে অনেক ক্ষেত্রেই ফসল রক্ষা হয় না৷ এটা বরং মানুষকে ফলস সেন্স অব সিকিউরিটি দেয় যে,এগুলো আমাদেরকে রক্ষা করবে৷ খালেকুজ্জামান বলেন, এই বাঁধের কারণে ভূউপরিউস্থ পানি,বৃষ্টির পানি গড়িয়ে গিয়ে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে৷ পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে গতি কিছুটা স্লথ হয়ে পড়ে৷ তাতে করে পানিটা সরতে গিয়ে সময় লাগে৷ বন্যাটা আরো বেশি প্রলম্বিত হয়৷ ফসল রক্ষা বাঁধ না করলে চলবে কী করে-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন,না করে করতেই পারলে ভালো৷ আমি নিজে কৃষি বিজ্ঞানী না৷ তবে হাজার বছর ধরে আমাদের পূর্বপুরুষরা নিশ্চয়ই ফসল রক্ষা বাঁধের উপর নির্ভর করতেন না৷ করলেও তখন বাঁধগুলো ছিল ভিন্ন৷ যেমন,তখন বলা হতো অষ্টমাসি বাঁধ৷ আট মাস ধরে বাঁধ থাকবে৷ তারপর সেটাকে সরিয়ে দেয়া হবে৷ প্রকৃতির সাথে মিল রেখে বাঁধ৷ এই অষ্টমাসি বাঁধকে মাথায় রেখে নতুন কিছু করা যেতে পারে বলে মত তার৷ তিনি বলেন,হাওর অঞ্চলের সব পানিই নিষ্কাসিত হয় ভৈরব ব্রিজের নিচ দিয়ে৷ সেখানে আগে একটা ব্রিজ ছিল৷ এখন আরো দুইটা ব্রিজ হয়েছে৷ ভৈরবের বাঁধের নিচে একটা বটল নেক তৈরি হয়েছে৷ আগে বলেছি,ভাটিতে নদীর প্রস্থ বাড়তে হয়৷ ‘‘কিন্তু এখানে উল্টো হয়েছে৷সেখানে পানি ধারণ ক্ষমতা কমে গেছে৷ সংকুচিত হয়ে গেছে৷ পিলারের কারণে পলি জমে ধারণ ক্ষমতা আরো কমে গেছে৷ তাই কেবল এই বন্যা নয়৷ অন্যান্য বন্যায়ও পানি সরতে সময় বেশি নেয়৷ এ কারণে হাওরের বন্যা আরো বেশি জলাবদ্ধতা তৈরি করে,আরো বেশি ক্ষতির কারণ হয়৷” হঠাৎ করে প্রকল্প গ্রহণের বিরোধিতা করে তিনি বলেন, অলওয়েদার সড়ক কিন্তু ডেল্টা প্লানেও নেই৷ হাওর মাস্টার প্লানেও নেই৷ জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ভবিষ্যতে বন্যা আরো বাড়বে: ড.মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান বন্যার দুর্দশা ও ভবিষ্যতের প্রস্তুতি এবারের হঠাৎ বন্যায় থমকে যায় সিলেট অঞ্চল৷ কেবল খাদ্য-পানি-আর আশ্রয়ের সংকটই ছিল না৷ বিদ্যুৎ চলে যায়, মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ হয়ে যায়৷ চার্জের কারণেও অনেকে মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে পারেননি৷ সিলেটের সাংবাদিক দ্বোহা চৌধুরী এই বন্যা খুব কাছে থেকে কাভার করছেন৷ বন্যার শুরু থেকেই সিলেট-সুনামগঞ্জ অঞ্চলের নানা এলাকা তিনি চষে বেড়িয়েছেন৷ ‘৮০০ টাকার নৌকা ভাড়া এখন ৫০ হাজার'-শিরোনামে তার একটি প্রতিবেদন ভাইরাল হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে৷ এই প্রতিবেদনের পেছনের গল্প প্রসঙ্গে গিয়ে তিনি বলেন,শুরুতেই ডুবে যাওয়া কোম্পানিগঞ্জ ও গোয়াইনঘাট উপজেলায় যেতে সিলেটের সালুটিকর থেকে বড় নৌকা বা ট্রলার যায়৷ ‘‘আগের দিনই (১৭ জুন)সিলেটের লোকাল গ্রুপগুলোতে চোখে পড়েছে যে, অনেকে বলেছে, নৌকা ভাড়া অনেক বেশি৷ সেই কারণে তারা ত্রাণ নিয়ে যেতে পারছে না৷” ‘‘পরদিন গিয়েও দেখলাম,নৌকা ভাড়াটা বেশি চাচ্ছে৷"অনেক বেশি টাকা দিয়েও অনেকে নৌকা পাচ্ছিলেন না৷ কিছু কিছু ক্ষেত্রে এমনও হয়েছে৷ তখন ওখানে গিয়ে এই সিনারিটা চোখে পড়লো৷” এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন,প্রথম দুই তিন দিনে এটা কমন হয়েই গিয়েছিল৷ এই দুই উপজেলার অনেক মানুষ সিলেট শহরে চাকরি করেন,সিলেট শহরে থাকেন৷ ফ্যামিলি ওখানে থাকে৷ সাপ্তাহিক ছুটির দিনে যান, আবার শহরে চলে আসেন৷ ‘‘ওইদিকে পানি রাতারাতি বাড়ছে৷ তাই আগে থেকে ওইদিকে যাওয়া বা তাদেরকে নিয়ে আসার সুযোগ হয় নাই৷ নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে৷ যোগাযোগও করতে পারছেন না৷ এমন একটা পরিস্থিতি হয়েছে যে, সব মানুষ ওখান থেকে রওনা দিতে চাচ্ছে৷ এটাও একটা কারণ,এর ফলে সেখানকার মাঝিরা তৎক্ষণাত একটা সুযোগ নেয়ার চেষ্টা করেছে৷” ‘‘নিয়মিত মাঝিদের পাশাপাশি বালু ও পাথর পরিবহনের ট্রলারগুলোও সালুটিকরঘাটে এসে পরিবহন করছিল৷ তারাও অনেক বেশি চার্জ করছিল৷কারণ ডিমান্ড ছিল টু-মাচ৷” তবে এখন পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি৷ তিনি বলেন,দুইদিন আগেও (২০ জুন)ত্রাণের একটি নৌকাকে ভাড়া দিতে হয়েছে ১০ হাজার টাকা৷ এখন (২২জুন)অনেকে কমেছে৷ তবে কিছু কিছু জায়গায় অনেক কম টাকায় বা বিনামূল্যেও কেউ কেউ নৌকার সাপোর্ট দিচ্ছেন৷ কেউ কেউ তেল খরচেও সার্ভিস দিচ্ছে৷ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন,এখন পর্যন্ত ত্রাণ কার্যক্রম সন্তোষজনক না৷ আমরা সিলেট ও সুনামগঞ্জের কথা বলছি৷ গতকাল দূর-দূরান্তের গ্রামের খবরও পাচ্ছি৷ ত্রাণ কার্যক্রম সন্তোষজনক না৷ ‘‘আজকেও একটা রিপোর্ট করেছি,সিলেটে কী পরিমাণ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে,সেটা পানিবন্দি মানুষের তুলনায় কতটুকু৷ আমাদের হিসাব বলছে,পার হেড ৪৪০ গ্রাম চাল সরকার বরাদ্দ দিয়েছে৷ বণ্টনের কথা যদি বলি,অনেক আশ্রয়কেন্দ্রে বুধবারও ত্রাণ পৌঁছায়নি৷” ‘‘বিশেষ করে,সিলেটের কোম্পানিগঞ্জ,গোয়াইনঘাট,সুনামগঞ্জের ছাতক,দোয়ারাবাজার বিস্মম্ভরপুর-এ সব এলাকার রিমোট জায়গাগুলোতে সরকারি ত্রাণ এখনো (২২জুন) পৌঁছায় নাই৷” সিলেটে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো আশ্রয়কেন্দ্র হিসাবে ব্যবহার করতে পারলেও সুনামগঞ্জে হাওরাঞ্চলে আশ্রয়কেন্দ্রেরও সংকট রয়েছে বলে মনে করেন তিনি৷ তবে সবচেয়ে বেশি সংকট তিনি দেখছেন সমন্বয়ে৷ শহরের আশেপাশে অনেক এলাকায় বারবার ত্রাণ বিতরণ হলেও অনেক এলাকা রয়েছে যেখানে কেউ যাচ্ছে না৷ তার মতে,মুখে জেলা প্রশাসন যদিও সমন্বয়ের কথা বলছেন৷ কিন্তু ত্রাণ বিতরণ করতে কোন এলাকায় যেতে হবে, সেটা যে কেউ যে কোন সময় জানার কোন ব্যবস্থাপনা তার চোখে পড়েনি৷ সিলেটের গোয়াইনঘাট,জাফলং এবং জৈন্দাপুর এলাকায় ত্রাণ বিতরণে ছিলেন ফ্যাক্ট চেকার আমির শাকির৷ বুধবার তিনি ডয়চে ভেলেকে বলেন,তার ঘুরে দেখা এলাকায় পানি পাঁচ ফিটের মত কমে গেছে৷ খাটের উপরে যাদের পানি উঠেছিল,তাদের উঠান থেকেও পানি নেমে গেছে৷ পথে অনেক বাড়ি একেবারে ভেঙে পড়েছে বলেও দেখেছেন তিনি৷ আবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এমন বাড়িও তার চোখে পড়েছে৷ ভেঙে পড়া বাড়ির সংখ্যা ১-২ শতাংশ এবং ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ির সংখ্যা ৩০ শতাংশের মত হতে পারে বলে তার ধারণা৷ বাংলাদেশের বন্যায় প্রকৃতি ও অপরিকল্পিত অবকাঠামোর দায় সাত বছরে একবার বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, প্রতি শতাব্দীতে বঙ্গীয় বদ্বীপ প্রায় অর্ধডজন বন্যার মুখে পড়েছে, যেগুলো ব্যাপকতায় ১৯৮৮ সালের প্রলয়ঙ্করী বন্যার প্রায় সমান৷ ১৮৭০ থেকে ১৯২২ সাল পর্যন্ত মাঝারি আকারের বন্যা গড়ে প্রতি দুই বছরে একবার এবং ভয়াবহ বন্যা গড়ে ছয়-সাত বছরে একবার সংঘটিত হয়েছে৷ ১৯২৭ সালে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতি সাত বছরে একবার ব্যাপক বন্যা আর ৩৩-৫০ বছরে একবার মহাপ্রলয়ংকরী বন্যা হয়৷ বাংলাদেশের বন্যায় প্রকৃতি ও অপরিকল্পিত অবকাঠামোর দায় ভয়াবহ যত বন্যা ১৯৬৮ সালে সিলেট অঞ্চলের বন্যায় সাত লাখ লোক ক্ষতিগ্রস্ত হন৷ ১৯৮৭ সালে সারা দেশের ৪০ শতাংশের বেশি এলাকা প্লাবিত হয়৷ ১৫ থেকে ২০ দিন স্থায়ী হলেও ১৯৮৮ সালের বন্যা গত শতকের অন্যতম ভয়াবহ, যাতে ৬০ শতাংশ এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত ও ব্যাপক প্রাণহানি হয়৷ এছাড়া ১৯৯৮ সালে দেশের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি দুই মাসের বেশি বন্যা কবলিত থাকে, যা ১৯৮৮ সালের বন্যার সঙ্গে তুলনীয়৷ ২০০০, ২০০৭ ও ২০১৭ সালেও ভয়াবহ বন্যায় পড়ে বাংলাদেশ৷ বাংলাদেশের বন্যায় প্রকৃতি ও অপরিকল্পিত অবকাঠামোর দায় প্রাকৃতিক, নাকি মানবসৃষ্ট? বন্যার যেসব কারণের কথা বলা হয় তার মধ্যে রয়েছে: ভারি বৃষ্টিপাত, হিমালয়ের তুষার গলা, পলিতে নদীর তলদেশ ভরাট/দখল বা ভূমিধ্বস, প্রধান নদীগুলোর পানি বৃদ্ধি, প্রকৃতির উপর মানবীয় হস্তক্ষেপ, সমুদ্রপৃষ্ঠের পরিবর্তন, ভূমিকম্পসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক পরিবর্তন ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব৷ বাংলাদেশের বন্যায় প্রকৃতি ও অপরিকল্পিত অবকাঠামোর দায় 'উন্নয়ন': নতুন সংকট সাম্প্রতিক সময়ে বন্যার জন্য অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণকেও দায়ী করে আসছেন বিশেষজ্ঞরা৷ বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)-র চলতি মাসের সংবাদ সম্মেলন অনুযায়ী, মেঘনা অববাহিকায় ১৬টি আন্তঃদেশীয় নদী আছে৷ ভারত ইচ্ছেমতো সেখানে বাঁধ দিয়ে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা দিচ্ছে৷ উন্নয়নের নামে সিলেটের হাওর অঞ্চল ভরাট, রাস্তা, বাঁধ তৈরি করে পানির প্রবাহে বাধা দেয়াকেও চলতি বন্যার কারণ হিসেবে অভিহিত করেছে তারা৷ বাংলাদেশের বন্যায় প্রকৃতি ও অপরিকল্পিত অবকাঠামোর দায় ব্যবস্থাপনায় গলদ বাংলাদেশে বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও নির্গমন প্রকল্প মূলত বাঁধ, পোল্ডারের মতো অবকাঠামো নির্ভর৷ কাঠামোগত পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীলতা, সেই সঙ্গে সড়ক, মহাসড়ক ও রেলপথের মতো অন্যান্য স্থাপনাসমূহ পানির প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে৷ এর প্রভাবে অনেক ক্ষেত্রে দেশে বন্যা পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়। বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও নির্গমন প্রকল্পসমূহে প্রচুর বিনিয়োগ সত্ত্বেও এ ক্ষেত্রে ফলাফল সন্তোষজনক নয় বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা৷ বাংলাদেশের বন্যায় প্রকৃতি ও অপরিকল্পিত অবকাঠামোর দায় প্রতিরোধ পরিকল্পনা ১৯৮৯ সালে বন্যা প্রতিরোধ পরিকল্পনা প্রণয়ন করে সরকার৷ কাঠামোগত প্রতিরোধ কার্যক্রম এবং বন্যা প্রতিরোধের লক্ষ্যে ১১টি নির্দেশনামূলক নীতি প্রণয়ন করা হয়৷ এর অংশ হিসেবে বর্তমানে প্রতিবছর এক লাখ ৩০ হাজার হেক্টর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণের কৌশল অনুসরণ করছে সরকার৷ মুনাফা ও নিরাপত্তার দিক থেকে উপকারিতা থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে এর পরিবেশগত প্রভাব যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি বলে অভিযোগ বিশেষজ্ঞদের৷ বাংলাদেশের বন্যায় প্রকৃতি ও অপরিকল্পিত অবকাঠামোর দায় যা প্রয়োজন... কাঠামোগত পদক্ষেপের বাইরে বিকল্প কৌশল হিসেবে অ-কাঠামোগত পদক্ষেপগুলোকেও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা৷ এর মধ্যে আছে নদ-নদীর উপচে পড়া পানি হ্রাসের জন্য ভূমি ব্যবস্থাপনা, ভূমি ব্যবহার পরিবর্তন এবং বিল্ডিং কোডের যথাযথ প্রয়োগসহ শস্যের বহুমুখীকরণ৷ আর সবশেষ প্লাবনভূমিগুলোকে বিভিন্ন অঞ্চলে ভাগ করা এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ভূমি ব্যবহার জোন তৈরি করা৷ বন্যার পূর্বাভাস কতটা সম্ভব? বাংলাদেশের বন্যার পূর্বাভাস দেয়ার জন্য রয়েছে সরকারি একটি প্রতিষ্ঠান৷ এর নাম ‘বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র'৷ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো.আরিফুজ্জামান ভূঁইয়া বলেন, বন্যা হওয়ার আগে আমরা বুঝতে পারি এবং সেই অনুযায়ী আমরা পূর্বাভাসও দেই৷ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন,আমাদের পরে সরকারের প্রায় ১৭টা মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর আছে, যারা এই বন্যা ব্যবস্থাপনার সাথে জড়িত৷সবারই নিজেদের অবস্থান থেকে কিছু দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে৷ ‘‘কেউ বার্তাটা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়৷ কেউ রেসকিউ অপারেশনের প্রস্তুতি নেয়৷ কেউ খাদ্য সামগ্রীর বিষয়ে প্রিপারেশন নেয়৷ কেউ হয়ত লাইভ স্টকের বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়৷ বিভিন্ন সংস্থার কাজ থাকে এখানে৷” ‘‘আমাদের পূর্বাভাসে থাকে যে,উজানে ভারি বৃষ্টিপাত হবে৷ নদনদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করবে৷ কোন কোন ক্ষেত্রে আমরা হয়ত মেয়াদটা বলি, এই কয়দিনের বন্যা হবে৷” ‘‘তার ভিত্তিতে প্রশাসনকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে,কে কোন এলাকায় আছে, কার জন্য কতটা বিপদ আসবে৷ আমরা প্রতিটা পয়েন্টের জন্য আলাদা আলাদাভাবে বলে দিতে পারবো না যে, এখানে সাধারণ বন্যা হবে, ওখানে তীব্র বন্যা হবে৷” চেরাপুঞ্জির বৃষ্টিটা আঁচ করতে পেরেছিলেন কি-না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন,আমরা কেন সবারই একটা সাধারণ ধারণা থাকা উচিত,এ বছর যেহেতু এপ্রিল মাসে তীব্র বৃষ্টি হলো৷ এরপর আবার মে মাসে বৃষ্টি হলো৷ সেটাও তীব্র হলো এবং জুন মাসের বৃষ্টির আগে যখন আমরা ওয়ার্নিং দিলাম৷ ‘‘তখনও সাধারণ মানুষ যদি এটা বুঝতে না পারে৷ প্রশাসন বা প্রস্তুতি নেয়ার জায়গা যাদের আছে, তারা যদি বুঝতে না পারে৷ সেক্ষেত্রে এরচেয়ে দুর্ভাগ্যের আর কিছু নাই৷” ‘‘আমরা আমাদের ওয়ার্নিং বার্তাটা তৈরি হওয়া মাত্র আমরা পৌঁছে দেয়ার চেষ্টা করি৷ তারা যে পাচ্ছে,সেটাও আমরা নিশ্চিত করি৷ এরপরের পদক্ষেপ তাদের,আমাদের না৷” এক প্রশ্নের জবাবে বুয়েটের ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার অ্যান্ড ফ্লাড ম্যানেজমেন্টের পরিচালক অধ্যাপক ড. এ কে এম সাইফুল ইসলাম বলেন,আমাদের পূর্বাভাস কেন্দ্র মুনসুন ফ্লাডের জন্য পূর্বাভাস দেয়ার কাজ মোটামুটি দক্ষতার সাথেই করেন৷ তিনি বলেন,আমাদের প্রায় ৯০ শতাংশ পানি দেশের বাইরে থেকে আসে৷ সেই সব নদীর তথ্য-উপাত্তও আমাদের কাছে অত একুরেটলি থাকে না৷ এটা দুই দেশের বা একাধিক দেশের যারা বেসিন শেয়ার করছে,তাদের মধ্যে তথ্য আদান প্রদান বাড়লে বেসিনওয়াইজ ফ্লাড ফোরকাস্টিং করলে সেটা অনেক একুরেটলি করা সম্ভব৷ তিনি বলেন,ইউরোপে অনেক দেশে এগুলো একইসাথে করে থাকে৷ আমাদের আরো সঠিকভাবে ফোরকাস্ট করতে হলে সেটা যৌথভাবে করা সম্ভব৷ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন,এই জন্য আমাদের স্বেচ্ছাসেবী তৈরি করা নাই৷ অনেক এলাকায় আমাদের বন্যার আশ্রয়কেন্দ্র নাই৷ একটা বন্যার আশ্রয়কেন্দ্র হওয়ার যে ক্রাইটেরিয়া যে,তার রাস্তা থাকতে হবে,টয়লেটসহ অন্যান্য সুবিধা থাকতে হবে৷ আমাদের এই জায়গায়ও একটু কাজ করা দরকার৷ কারণ বন্যা এখন যেভাবে আসছে,আমাদের বন্যা আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়ানো দরকার৷ ‘‘বিশেষ করে গবাদিপশু নিয়ে আশ্রয় নেয়ার মত জায়গা থাকে না৷ উত্তরবঙ্গের দিকে কিছু আশয়কেন্দ্র আছে৷ যেহেতু প্রতি বছর বন্যা হয়৷ বিশেষ করে চরে৷ উত্তর-পূর্বাঞ্চলে আশ্রয়কেন্দ্র কম৷” ‘‘স্বেচ্ছাসেবী আমাদের কম৷ এটার এটাও হতে পারে,এটা অতটা ডেডলি ফর্মে আসে না৷ কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, দুর্যোগ মোকাবেলায় এখানেও আমাদের স্বেচ্ছাসেবী দরকার৷” তিনি বলেন,ইন্ডিয়া মেটিওরোলোজিকাল ডিপার্টমেন্ট গত ৮জুন পুর্বাভাসে জানিয়েছিল যে, ১৬ জুন উত্তর-পূর্ব ভারত ও বাংলাদেশে ভারী বৃষ্টিপাত হবে৷ অবশ্য ১ হাজার মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টির পূর্বাভাস এখনো সম্ভব নয়৷ চারদিকে পানি, তবু খাওয়ার পানি নেই ভবিষ্যতে যা করতে হবে অধ্যাপক খালেকুজ্জামান বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ভবিষ্যতে বন্যা আরো বাড়বে৷ এমনকি অকাল বন্যা হবে৷ সেগুলোও আমি আমার গবেষণায় পেয়েছি৷ ‘‘বৃষ্টিপাতের ধরণ পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে ইদানিং৷ আগে মে জুনে বেশি বৃষ্টিপাত হতো৷ এখন একটু আগে হয়৷ এ জন্য ফসলে কিছু পরিবর্তন আনতে হতে পারে৷ বন্যা সহনশীল ফসল করা যায়, সেটা ভাবতে হবে৷” তিনি বলেন, সিলেট শহর অনেক উঁচু৷ সিলেটে গেলে দেখবেন, নদীগুলো অনেক নিচু৷ কিন্তু সিলেটে গেলে দেখবেন, নদীগুলোর বেহাল দশা৷ সুনামগঞ্জেও তাই৷ বন্যা এতটা ব্যাপকভাবে হবে, সেটার জন্য মানুষ প্রস্তুত ছিল না৷ তিনি বলেন,আমাদের প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াগুলো বুঝে নিয়ে প্রকৃতির সাথে খাপখাইয়ে কীভাবে বাস করা যায়, সেই লক্ষ্যে আমাদেরকে অনেক বেশি মনোযোগী হতে হবে৷ অনেক বেশি কার্যকলাপ করতে হবে৷ অনেক বেশি গবেষণা করতে হবে৷ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রকৃতিকে বুঝতে পারার মত তেমন কোন প্রকল্প ডেল্টা প্লানেও নেই৷ বদ্বীপের গঠন প্রক্রিয়া জানার জন্যই একটা প্রকল্প হতে পারতো৷ তিনি বলেন, মেঘালয়ে অনেক পাহাড় কাটা হয়,অনেক মাইনিং হয়, অনেক বন উজাড় করা হয়৷ সেখান থেকেই মূলত পলি ও পাথর সরে আসে৷ বাংলাদেশের অভ্যন্তরেও যখন নির্মাণ কাজ করা হয়, পাহাড়-টিলা কাটা হয়, কৃষি কাজ করা হয়-সেগুলোও বাড়তি পলির জন্ম দেয়৷ ‘‘এই পলিতে কিছুটা বালু আছে৷ কিছুটা কাদামাটি আছে৷ বালুকে নির্মাণে বাণিজ্যিক কাজে লাগানো যেতে পারে৷ এ ব্যাপারে স্টাডি হওয়া প্রয়োজন৷ পলি খনন,পলি সরানো এবং পলিটাকে কাজে লাগানো৷ এটাকে সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মধ্যে নিয়ে আসতে হবে৷” ‘‘পলি সরিয়ে আমাদের নদীর ধারণ ক্ষমতাকে আগের চেয়েও বাড়াতে হবে৷ কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাড়তি বৃষ্টি তৈরি হয়েছে৷’’ ‘‘সেই বাড়তি বৃষ্টিকে আমাদের একোমোডেট করতে হবে৷ চলে যাওয়ার সুযোগ দিতে হবে৷ এ জন্য আমাদের নদী-নালা খাল-বিলের ধারণ ক্ষমতা আরো বাড়াতে হবে৷’’ আব্দুল হাই আল হাদী বলেন, সিলেট বিভাগে ১৬টি স্বীকৃত আন্তঃসীমান্ত নদী আছে৷ এর বাইরে আরো প্রায় অর্ধ শতক নদী আছে, এগুলো দুই দেশকে স্বীকৃতি দিতে হবে৷ ‘‘নদীর ভাগাভাগির বিষয়টা,দায় যেহেতু বাংলাদেশের বেশি-সুতরাং বাংলাদেশকে একটু অগ্রণী ভূমিকা নিয়ে পারস্পরিক তথ্য বিনিময়,বিশেষ করে ওখানকার আবহাওয়ার পূর্বাভাসটা আগাম যেন আমরা সিলেট থেকে জানতে পারি৷ তাহলে এখানকার মানুষরা দ্রুত সতর্ক হতে পারবে৷ জানমালের ক্ষতি কম হবে৷’’ কোম্পানীগঞ্জে বন্যাদুর্গতদের বেঁচে থাকার লড়াই প্লাবিত গ্রামের পর গ্রাম এবারের বন্যায় কোম্পানীগঞ্জের শতাধিক গ্রাম এবং কয়েকশ হেক্টর আবাদি জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। ভেসে গেছে মাছের ঘের। উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নের সব গ্রামই পানির নীচে তলিয়ে গেছে বলে জানান জনপ্রতিনিধি এবং স্থানীয় বাসিন্দারা। কোম্পানীগঞ্জে বন্যাদুর্গতদের বেঁচে থাকার লড়াই মসজিদ ডুবেছে, নামাজ হচ্ছে সড়কে সিলেট-কোম্পানীগঞ্জ সড়কের বর্নি এলাকায় গিয়ে দেখা গেল, সেখানে সড়কে ওয়াক্তের নামাজ এবং মৃতের জানাজার নামাজ পড়া হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দা আবুল কাশেম জানান, সড়কের পাশেই তাদের মসজিদ থাকলেও বন্যার পানিতে মসজিদটি ডুবে যাওয়ায় গত তিন দিন যাবত রাস্তাতেই নামাজ পড়তে হচ্ছে। কোম্পানীগঞ্জে বন্যাদুর্গতদের বেঁচে থাকার লড়াই এখনো আছে বন্যার পানির চিহ্ন কোম্পানীগঞ্জের দক্ষিণ রণিখাই ইউনিয়নের আন্দুরাকান্দি গ্রামে পানির উচ্চতা কমলেও এখনো সেখানে হাঁটু পানি। তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র সাব্বির মোল্লা তাদের ঘরের দেয়ালে পানির দাগ দেখিয়ে জানায়, পানি নেমেছে দুই দিনে প্রায় দেড় হাত, ঘরে পানি না থাকলেও উঠানে এখনো পানি আছে। কোম্পানীগঞ্জে বন্যাদুর্গতদের বেঁচে থাকার লড়াই আরেক আতঙ্ক সাপ উত্তর ও দক্ষিণ রণিখাই ইউনিয়নের মধ্যবর্তী একটি খাল পার হওয়ার সময় দেখা যায় একটি সাপ সাঁতরে উঁচু জায়গায় ওঠার চেষ্টা করছে। স্থানীয় ট্রলারের মাঝি হাবিবুর রহমান জানান, বন্যায় অনেক বাসাতেই সাপের দেখা মেলে। অনেক সাপ বিষধর আবার অনেকগুলো নির্বিষ।হাওরে দেখা মেলা সাপটি বিষধর দাবি করে স্থানীয়রা বলেন এটিকে তারা ‘আলোদ সাপ’ নামে চেনেন। কোম্পানীগঞ্জে বন্যাদুর্গতদের বেঁচে থাকার লড়াই বাড়িতে ফেরা শুরু সিলেট অঞ্চলে মে মাসে বন্যা হলেও গত ১৬ জুন আকস্মিক বন্যাতে এ অঞ্চলের মানুষ হতবিহ্বল হয়ে পড়েন। তাৎক্ষণিকভাবে ঘরবাড়ি ছেড়ে কোনোমতে প্রাণে বাঁচেন তারা। তবে গত দুইদিনে পানি কমতে শুরু করায় অনেকেই এখন বাড়িতে ফিরছেন। কোম্পানীগঞ্জে বন্যাদুর্গতদের বেঁচে থাকার লড়াই চাল, ডাল পচছে দক্ষিণ রণিখাই ইউনিয়নের আন্দুরাকান্দি গ্রামে ট্রলার থেকে নেমে দেখা গেল, এক বাড়ির উঠানে চৌকিতে আলু, পেঁয়াজ এবং নানা ধরনের শুকনো খাবার রোদে শুকাতে দেওয়া হয়েছে। পাশে বসে থাকা রমজান আলী জানান, বন্যার সময় অনেক কিছুই পানিতে থাকায় পচে যাওয়ার দশা হয়েছে, তাই বাড়িতে ফিরেই সেগুলো শুকাতে দিয়েছেন। কোম্পানীগঞ্জে বন্যাদুর্গতদের বেঁচে থাকার লড়াই নিজ দায়িত্বেই আশ্রয়কেন্দ্রে কোম্পানীগঞ্জের দক্ষিণ রণিখাই ইউনিয়নের ওয়ার্ড মেম্বার আবদুর রহমান বলেন, ‘‘বন্যার শুরুতে আমাদের তেমন কিছু করার ছিল না। মানুষ নিজ দায়িত্বেই আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে গিয়েছে। সরকারি ত্রাণ আসছে, আমরা জনপ্রতিনিধিরা এতদিন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিলাম, তবে সোমবার থেকে আমরা সমন্বয় করে সাধারণ মানুষকে সাহায্য সহযোগিতা করছি।’’ কোম্পানীগঞ্জে বন্যাদুর্গতদের বেঁচে থাকার লড়াই ভারতে আশ্রয় নেয়া গরু... কোম্পানীগঞ্জ উত্তর রণিখাই ইউনিয়নের বিজয়পাড়ুয়া হাওড়া গ্রামের নাজির আহমেদ জানান, সপ্তাহখানেক আগে আকস্মিক বন্যা শুরু হলে তিনি তার পোষা তিনটি গরু ভারতের মেঘালয়ের পাহাড়ের নীচে বেঁধে রাখেন। পানি কিছুটা কমায় গরুগুলোকে তিনি বাড়িতে নিয়ে আসছেন৷ কোম্পানীগঞ্জে বন্যাদুর্গতদের বেঁচে থাকার লড়াই ত্রাণ বিতরণ এবারের বন্যায় এখন পর্যন্ত সরকারি পর্যায়ের চেয়ে বিভিন্ন কর্পোরেট সংস্থা, বেসরকারি সংগঠন এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগে ত্রাণ বিতরণই বেশি দেখা গেছে। কোম্পানীগঞ্জে বন্যাদুর্গতদের বেঁচে থাকার লড়াই এখনো অনেক বাড়িঘর পানির নীচে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার উত্তর রণিখাই ইউনিয়নের বাসিন্দা এবং ট্রলারের মাঝি হাবিবুর রহমান জানান, অনেক বাড়িঘর থেকে পানি নেমে গেলেও যেগুলো একটি নিচু জমিতে ছিল, সেগুলো এখনো ছাদ সমান পানিতে। এখন বাড়ির ছাদ কিছুটা দেখা গেলেও বন্যার শুরুতে এগুলো চোখে দেখাই যায়নি। কোম্পানীগঞ্জে বন্যাদুর্গতদের বেঁচে থাকার লড়াই গবাদিপশু নিয়ে বিপত্তি সিলেটে আগে কখনো এমন বন্যা দেখেননি জানিয়ে বেতমুরা গ্রামের রণদা বিশ্বাস বলেন, ‘‘হুট করে বন্যার পানি ঢুকে পড়ায় আমরা ভয় পেয়ে যাই। বন্যার অভিজ্ঞতা না থাকায় সবার বাড়িতে নৌকাও নেই। আমরা কোনোমতে ছোট ডিঙ্গি নৌকায় উঠতে পারলেও গরু-ছাগলকে তো তোলা যায় না। খুব বিপদে ছিলাম আমরা সবাই।’’ কোম্পানীগঞ্জে বন্যাদুর্গতদের বেঁচে থাকার লড়াই আশ্রয়কেন্দ্রে হুড়োহুড়ি উত্তর রণিখাই ইউনিয়নের রায়পুর গ্রামের রায়পুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রায় ২০টি পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। ত্রাণ দেওয়ার ট্রলার কাছে ভিড়তেই ত্রাণ নিতে হুড়োহুড়ি লেগে যায়। এ অবস্থা সব আশ্রয়কেন্দ্রেই দেখা যায় বলে জানান ত্রাণ বিতরণে অংশ নেওয়া নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্বেচ্ছাসেবী। কোম্পানীগঞ্জে বন্যাদুর্গতদের বেঁচে থাকার লড়াই ঘর উঁচু করেও লাভ হয়নি উপজেলার উত্তর রণিখাই ইউনিয়নের বিজয়পাড়ুয়া হাওড়া গ্রামের বাসিন্দা আসমা বেগম বলেন, ‘‘আমাদের বসতবাড়ি অন্য অনেকের চেয়ে উঁচু করেই বানিয়েছিলাম, কিন্তু আমাদের বাড়িতেও ছাদ সমান পানি ছিল। এদিকে এভাবে বন্যা হবে আমাদের কারো ধারণাতেই ছিল না।’’ কোম্পানীগঞ্জে বন্যাদুর্গতদের বেঁচে থাকার লড়াই পানি নামছে সিলেটের কোম্পানীগঞ্জের বঙ্গবন্ধু হাইটেক পার্ক এলাকার নিচু অংশ থেকে পানি পশ্চিম দিকে নেমে যাচ্ছে। তবে বৃষ্টি না হলে বন্যার পানি পুরোপুরি নামতে আরো হয়ত ১৫-২০ দিন লাগতে পারে বলে বলছেন স্থানীয়রা। তারা জানান, নদী এবং জলাশয়গুলো ভরে যাওয়ায় বন্যার পানি আটকে আছে, নামতে পারছে না দ্রুত। কোম্পানীগঞ্জে বন্যাদুর্গতদের বেঁচে থাকার লড়াই সেনাবাহিনীর তৎপরতা বন্যার পানিতে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারে সিলেট এবং সুনামগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলায় সেনাবাহিনীর ৭০০ জন সদস্য গত ১৭ জুন থেকে ব্যস্ত রয়েছেন। সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় সেনাবাহিনীর একটি স্পিডবোটকে ত্রাণ কার্যক্রম শেষে ক্যাম্পে ফিরে যেতে দেখা যায়। লেখক: মর্তূজা রাশেদ (সিলেট থেকে)