কোভিডে গাঁজা সেবনে উল্লম্ফন

title
২ মাস আগে
সোমবার প্রকাশিত জাতিসংঘের অফিস অন ড্রাগ অ্যান্ড ক্রাইমসের (ইউএনওডিসি) বার্ষিক প্রতিবেদনে অনুযায়ী, গাঁজা বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মাদক৷ বাজার শক্তিশালী হওয়ায় যার ব্যবহার ক্রমশ বাড়ছে৷ ২০১২ সালে চিকিৎসা বহির্ভূত গাঁজা ব্যবহারের বৈধতা দেয় যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ও কলোরাডো রাজ্য৷ পরবর্তীতে আরো কিছু রাজ্য তাদের পথ অনুসরণ করে৷ ২০১৩ সালে উরুগুয়ে এবং ২০১৮ সালে ক্যানাডা গাঁজা বেঁচাকেনা ও সেবনের বৈধতা দেয়৷ অন্য কিছু দেশও এমন পদক্ষেপ নেয়৷ তবে প্রতিবেদনে মূলত এই তিন দেশের দিকেই নজর দিয়েছে ইউএনওডিসি৷ বার্লিনে ‘৪২০’ উদযাপনে গাঁজা সেবন বৈধ করার দাবি কেন ‘৪২০’? গাঁজাসেবীদের কাছে দিনটি আসলে ৪২০, ৪:২০, বা ৪/২০৷ প্রতি বছরের চতুর্থ মাস, অর্থাৎ এপ্রিলের ২০ তারিখ বিকেল ৪টা ২০ মিনিটে বিশেষ এ দিনটি উদযাপন করা হয়৷ বার্লিনে ‘৪২০’ উদযাপনে গাঁজা সেবন বৈধ করার দাবি ৫০০ গাঁজাসেবীর সমাবেশ বুধবার বার্লিনের ব্রান্ডেনবুর্গ গেটের সামনে বিভিন্ন বয়স, শ্রেণি, পেশার অন্তত ৫০০ জন গাঁজাসেবী সমবেত হয়ে ‘৪২০’ উদযাপন করেন৷ প্রতিবছরের মতো এবারও গাঁজা সেবন বৈধ করার দাবি ছিল তাদের মুখে৷ জার্মানির বর্তমান জোট সরকার এর আগে দেশে গাঁজা বৈধ করার বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের অঙ্গীকার করছিল৷ তাই ‘৪২০’ দিবসে দাবিটা আরো জোরালোভাবে উঠে আসে গাঁজাসেবীদের মুখে৷ বার্লিনে ‘৪২০’ উদযাপনে গাঁজা সেবন বৈধ করার দাবি বার্লিনে যারা ছিলেন বুধবার ব্রান্ডেনবু্র্গ গেটের সামনে হাজির ছিলেন বিভিন্ন বয়স এবং পেশার গাঁজাসেবী৷ সাধারণ চাকুরিজীবী, অ্যাক্টিভিস্ট, র্যাপার, সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা, আইনজীবী, ক্ষুদ্র গাঁজা ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি পথ্য হিসেবে গাঁজা সেবন করেন এমন রোগীরাও ছিলেন সেখানে৷ বার্লিনে ‘৪২০’ উদযাপনে গাঁজা সেবন বৈধ করার দাবি সরকারের অবস্থান গত ডিসেম্বরে জোট সরকারের পক্ষ থেকে লাইসেন্সধারী দোকানে প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য সীমিত পরিমানে গাঁজা বিক্রি বৈধ করার আইন প্রণয়নের অঙ্গীকার করা হয়েছিল৷ সরকার মনে করে, সীমিত পরিসরে গাঁজা সেবনকে বৈধতা দিলে ভেজাল গাঁজা সেবন বন্ধ করা এবং তরুণ সম্প্রদায়কে নেশাগ্রস্থ হওয়া থেকে রক্ষা করা নিশ্চিত করা যাবে৷ জোট সরকারের অন্যতম শরিক গ্রিন পার্টি বুন্ডেসটাগে এ বিষয়ে ইতিমধ্যে একটা খসড়া জমা দিয়েছে৷ বার্লিনে ‘৪২০’ উদযাপনে গাঁজা সেবন বৈধ করার দাবি গাঁজাসেবীদের দাবি বুধবার ব্রান্ডেনবুর্গ গেটে সমবেত হয়ে গাঁজাসেবীরা জোট সরকারের কাছে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব গাঁজাসেবনকে আর অপরাধ হিসেবে গণ্য না করার আইন প্রণয়নের দাবি জানান৷ বার্লিনে ‘৪২০’ উদযাপনে গাঁজা সেবন বৈধ করার দাবি জার্মানিতে গাঁজাসেবন জার্মানিতে ৪০ লাখের মতো মানুষ গাঁজা সেবন করেন বলে ধারণা করা হয়৷২০২১ সালে ড্যুসেলডর্ফের হাইনরিশ হাইনে বিশ্ববিদ্যালয়ের করা এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২০ সালে সারা দেশে গাঁজা সংক্রান্ত মামলায় পুলিশের নানাভাবে যে ব্যয় করেছে তার আর্থিক মূল্য ১.৬৩ বিলিয়ন ইউরোর মতো৷ এর সঙ্গে আদালতের ব্যয় ৪৪৪.৭ মিলিয়ন ইউরোও যোগ করলে দেশের সার্বিক ব্যয়টা কিন্তু বিশাল৷ বার্লিনে ‘৪২০’ উদযাপনে গাঁজা সেবন বৈধ করার দাবি সরকারের ধীরে চলো নীতি জার্মানির মাদক ও নেশা সংক্রান্ত কেন্দ্রীয় সংস্থার এক মুখপাত্র বলেন, বর্তমান সরকার সীমিত পরিসরে গাঁজা সেবন বৈধ করার পক্ষে, তবে সরকার মনে করে, এ সংক্রান্ত আইনটি তাড়াহুড়ো করে প্রণয়ন করলে হিতে বিপরীত হতে পারে৷ কৃষি, অর্থনীতি, বিচার এবং পররাষ্ট্র- কমপক্ষে এই চারটি মন্ত্রণালয়ের মধ্যে আলোচনা করে প্রণয়ন করতে হবে আইনটি৷ তাই একটু সতর্কতা অবলম্বন করছে সরকার৷ প্রতিবেদনে তারা বলেছে, ‘‘গাঁজার বৈধতায় মাদকটির ব্যবহারে উর্ধ্বমুখী প্রবণতাকে ত্বরান্বিত করেছে৷'' তবে তরুণদের মধ্যে গাঁজা সেবনের প্রবণতা খুব একটা বাড়েনি৷ তারা বরং আরো উচ্চ ক্ষমতার মাদকের দিকে বেশি ঝুঁকেছে৷ তবে প্রতিবেদন বলছে, ‘‘নিয়মিত গাঁজা সেবনকারীদের মধ্যে মানসিক ব্যাধি ও আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়েছে৷'' প্রতিবেদনে দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে বিশ্বের ২৮ কোটি ৪০ লাখ মানুষ বা পাঁচ দশমিক ছয় শতাংশ জনগোষ্ঠী হেরোইন, কোকেন, অ্যাম্ফেটামিনসের মতো অন্তত একটি মাদকে আসক্ত ছিল৷ এর মধ্যে গাঁজা সেবনকারীর সংখ্যা ছিল ২০ কোটি ৯০ লাখ৷ বলা হয়েছে, কোভিড-১৯ মহামারির সময় লকডাউন ২০২০ সালে গাঁজা সেবনের প্রবণতা বৃদ্ধি করেছে৷ ঐ বছর কোকেন উৎপাদনও রেকর্ড পরিমাণ বেড়েছে৷ যেসব দেশে গাঁজা বৈধ আর্জেন্টিনা গাঁজা সেবন অনেক দেশেই আইনতভাবে অপরাধ নয়৷ এমনই একটি দেশ ল্যাটিন অ্যামেরিকার আর্জেন্টিনা৷ সেখানে চিকিৎসার জন্য গাঁজা আগে থেকেই বৈধ হলেও ব্যক্তিগত পছন্দে সেবনের জন্য গাঁজাকে ২০০৯ সাল থেকে বৈধতা দেওয়া হয়েছে৷ যেসব দেশে গাঁজা বৈধ জার্মানি ২০১৭ সালের ১০ মার্চ ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী রোগীদের গাঁজা সংগ্রহের অনুমতি দেয় জার্মান সরকার৷ অনুমোদনের পর দেশটিতে গাঁজার চাহিদা ব্যাপকহারে বেড়েছে৷ যেসব দেশে গাঁজা বৈধ অস্ট্রেলিয়া চিকিৎসার উদ্দেশ্যে গাঁজার সেবন ও চাষ অস্ট্রেলিয়ায় বৈধ৷ সেই দেশের আদিবাসীদের মধ্যে গাঁজা সেবনের মাত্রা শহরাঞ্চলে কিছুটা কম বলে জানা যায়৷ যেসব দেশে গাঁজা বৈধ বেলজিয়াম প্রাপ্তবয়স্করা সেবনের জন্য তিন গ্রাম ওজন পর্যন্ত গাঁজা সঙ্গে রাখতে পারবেন ইউরোপের দেশ বেলজিয়ামে৷ ২০০৩ সাল থেকে কার্যকরী এই আইনে মাথাপিছু একটি গাঁজা গাছ লাগানোকেও বৈধতা দেওয়া হয়েছে৷ যেসব দেশে গাঁজা বৈধ বলিভিয়া মাথাপিছু ৫০ গ্রাম গাঁজা কেনা বলিভিয়ায় বৈধ৷ যেসব দেশে গাঁজা বৈধ ক্যানাডা সারা বিশ্বে আলোড়ন তুলে সব রকমের গাঁজা সেবন ও চাষের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেছে ক্যানাডা সরকার৷ ২০১৮ সালের অক্টোবর মাসে নতুন আইন এনে গাঁজা সার্বিকভাবে বৈধ ঘোষণা করা হয়৷ যেসব দেশে গাঁজা বৈধ চিলি ল্যাটিন অ্যামেরিকার আরেক দেশ চিলিতেও ২০০৫ সাল থেকে বৈধ হয়েছে গাঁজা বা মারিহুয়ানার সেবন ও বিক্রি৷ যেসব দেশে গাঁজা বৈধ নেদারল্যান্ডস সেই ১৯৭৬ সাল থেকেই ইউরোপের নেদারল্যান্ডসে গাঁজা বৈধ৷ সেই দেশের বিখ্যাত ‘কফিশপ’-গুলিতে গাঁজা বিক্রি ও সেবন বৈধ হলেও পাঁচ গ্রামের বেশি গাঁজা রাখতে পারবেন না কেউ৷ যেসব দেশে গাঁজা বৈধ দক্ষিণ আফ্রিকা আফ্রিকার প্রথম দেশ হিসাবে দক্ষিণ আফ্রিকা ২০১৮ সালে গাঁজা সেবন ও গাঁজা চাষকে বৈধতা দেয়৷ প্রসঙ্গত, এই দেশের ডাক্তারেরা চিকিৎসার প্রয়োজনে গাঁজা সেবনের পরামর্শ দিতে পারেন ঠিকই, কিন্তু কোনো বিশেষ দোকান বা হাসপাতালে তা বিক্রির পরিষেবা এই মুহূর্তে নেই৷ যেসব দেশে গাঁজা বৈধ উরুগুয়ে ২০১৩ সাল থেকে উরুগুয়েতে সম্পূর্ণরূপে বৈধ হয়েছে গাঁজা সেবন ও বিক্রি৷ শুধু তাই নয়, নিষেধাজ্ঞা উঠেছে গাঁজা চাষের ওপর থেকেও৷ যেসব দেশে গাঁজা বৈধ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অঞ্চল অনুসারে ভিন্ন আইন থাকায় গাঁজা বা অন্যান্য মাদক বিষয়ক আইনও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভিন্ন৷ কিছু রাজ্যে ব্যক্তিগত সেবন বৈধ হলেও দেখা যায় যে, সেখানে গাঁজার চাষে রয়েছে নিষেধাজ্ঞা৷ কিন্তু ডাক্তারি পরামর্শে গাঁজা সেবন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনেক অংশেই বৈধ বলে জানা যায়৷ লেখক: শবনম সুরিতা এফএস/কেএম (রয়টার্স)