হিরো আলমের বিচার করে কে?

title
১৩ দিন আগে
তখন তার উত্থান পর্ব চলছে৷ সারাদেশে হিরো আলমকে নিয়ে আলোচনা৷ নানা সমালোচনা৷ কিন্তু আমার চোখে ধরা পড়েছে তার অদম্য ইচ্ছা এবং অমিত সাহস৷ কীভাবে গ্রামের এক তরুণপোশাকি সমাজকে চ্যালেঞ্জ করে নিজেকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন নিজস্ব ভঙ্গিতে৷ কোনো সমালোচনা তাকে দমাতে পারছে না৷ তাকে নিয়ে আমি এরপর লাইভ শো করেছি৷ ওই সময়ে একটি কলামও লিখেছি৷ "একজন হিরো আলম” শিরোনামের ওই কলামের শেষ কথা ছিলো,"যারা আলমকে নিয়ে মজা করছেন, হাসছেন, নিজেদের হিরো ভাবছেন তাদের উদ্দেশে আরেকটি কথা বলতে চাই৷ ধরে নিলাম হিরো আলম কাক৷ মনে রাখবেন আপনি কিন্তু ময়ূর নন৷” এরপর তার সাথে টেলিফোনে দুই-একবার কথা হয়েছে পেশাগত কারণে৷ আর তাকে নিয়ে সংবাদ মাধ্যমে সব সময়ই নানা আলোচনা সমালোচনা দেখেছি৷ তবে সর্বশেষ তাকে ডিবি অফিসে নিয়ে মুচলেকা আদায়ের ঘটনাটি শুনে প্রথমে বিস্মিত এবং পরে ক্ষুব্ধ হয়েছি৷ একটি মাত্র বাক্যে আমি আমার প্রতিক্রিয়া জানিয়েছি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে৷ আর তা হলো,"সবাই বিচারক হলে তো সমস্যা, যার কাজ তার করা উচিত৷'' হিরো আলমের বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলো পুলিশ তুলেছে তার মধ্যে প্রধান হলো "বিকৃত সুরে রবীন্দ্রসংগীত গাওয়া''৷ এই অভিযোগ আরো অনেকেই তুলেছেন৷ অভিযোগ করার অধিকার তো সবার আছে৷ কিন্তু বিচার করার অধিকার কার, পুলিশের? পুলিশ কি বিচারক? পুলিশও অভিযোগ করতে পারত আদালতে অথবা অন্য কোনো বিচারালয়ে৷ তারাই বিষয়টি দেখতে পারতেন৷ কিন্তু পুলিশ নিজেই নিজেকে রবীন্দ্রসংগীত বোদ্ধা হিসেবে জাহির করে নিজেই বিচারক সেজে গেল৷ এখানেই শেষ নয় তার নামের আগে হিরো শব্দটিও মুছে ফেলতে বলেছে৷ নিজের চেহারা নিজেকে দেখতে বলেছে৷ আপাতত নিরীহ মনে হলেও শেষের কথাগুলো প্রকারন্তরে এক ধরনের বর্ণবাদ৷ আমাদের সাংবাদিক বন্ধুরা এখন সেটা কিছুটা উপলব্ধি করতে পারলেও মুচলেকার শুরুতে নানা ধরনের আপত্তিকর শব্দ ব্যবহার করে খবর পরিবেশন করেছেন৷ মুখরোচক হেডিং করেছেন৷ তবে এখন তারাও মনে করছেন হিরো আলমের প্রতি অন্যায় করা হয়েছে৷ তাই তারা সরব হয়েছেন৷ আমার বিবেচনায় হিরো আলমকে তার মৌলিক মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে৷ তার প্রতি পুলিশি রাষ্ট্রের আচরণ করা হয়েছে৷ এর দায় তো পুলিশকেই নিতে হবে৷ হিরো আলমের প্রতি যেসব অন্যায় করা হয়েছে তা আমার বিবেচনায়- ১. বিচারকাজের দায়িত্বপ্রাপ্ত নয় এমন প্রতিষ্ঠান তার বিচার করেছে৷ এটা আসলে অবিচার৷ ২. আদালতে অপরাধ প্রমাণের আগেই তাকে শাস্তি দেয়া হয়েছে৷ এটা আইনবিরুদ্ধ কাজ৷ ৩. তার প্রতি সবলের অত্যাচার হয়েছে৷ ৪. তার প্রতি বর্ণবাদী আচরণ করা হয়েছে৷ ৫. তার ব্যক্তি স্বাধীনতা ও সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘন করা হয়েছে৷ হারুন উর রশদি স্বপন, ডয়চে ভেলে রবীন্দ্রসংগীত কীভাবে গাইতে হবে তা নিয়ে কথা তো হতেই পারে৷ সেটা নিয়ে সংগীত বিশেষজ্ঞরা মতামত দেরেন৷ কী করণীয় তাও তারা বলতে পারেন৷ আর সেটা বাস্তবায়নের পদ্ধতি কী হবে তারা তাও বলে দিতে পারেন৷ আমরা সেটা অনুসরণ করব নিশ্চয়ই৷ কিন্তু ডিবি পুলিশ হঠাৎ করে হিরো আলমের গানকে তো "গণ-উৎপাত” বলে দিলে হবে না৷ দেখা গেলো পুলিশ নিজেই এখন আইন লঙ্ঘন করেছে৷ এটাও তো একটা উৎপাত৷ এর বিচার করবে কে? কারো নামের আগে হিরো লাগাতেও কি পুলিশের অনুমতি লাগবে? তাই যদি লাগে তাহলে ভবিষ্যতে দেখা যাবে শিশু সন্তানের নাম রাখার আগেও পুলিশের অনুমতি লাগবে৷ নিজের চেহারা দেখার প্রশ্ন যদি ওঠে তাহলে ডিবির যে কর্মকর্তা এই কাজ করেছেন তার চেহারা নিয়েও তো প্রশ্ন উঠতে পারে৷ আর এই চেহারার তো নানা দিক আছে৷ আর যাই হোক হিরো আলমের বিরুদ্ধে তো ঘুস, দুর্নীতি বা অর্থ পাচারের অভিযোগ নেই৷ যাদের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ আছে তাদের চেহারা কি তারা দেখতে পান? রাষ্ট্রে তো অনেক বিকৃতি আছে৷ গণতন্ত্রে বিকৃতি আছে৷ নির্বাচনে বিকৃতি আছে৷ বিকৃতি আছে নানা সামাজিক ব্যবস্থায়৷ যদি বলি গানে বিকৃতি, তা তো আরো অনেক মহারথীও করছেন৷ তাহলে ওই পুলিশ কর্মকর্তা হাত-পা গুটিয়ে বসে আছেন কেন? বিচারে নেমে পড়ুন৷ নামছেন না কেন? ওই মহারথীদের ধরুন৷ আমি জানি ওই সব জায়গায় হাত দেয়ার ক্ষমতা বা দৌড় কোনোটাই তার নেই৷ উল্টো তিনি তাদের তোষণ করবেন৷ হিরো আলমের কিরুদ্ধে তার এই অনধিকার নাক গলানো ক্ষমতাবানদের তোষণেরই একটি অংশ৷ আর দেশের অনেককে নিয়েই তো বিতর্ক-সমালোচনা আছে৷ তাহলে তাদের কাছ থেকেও মুচলেকা আদায় করা হোক৷ তাদের গণ-উৎপাতও বন্ধ করা হোক৷ পারবেন কি আপনি, জনাব পুলিশ কর্মকর্তা? হিরো আলম দুর্বল, তার আর্থিক ক্ষমতা নেই৷ সে তেমন লেখাপড়া করে নাই৷ ছোট এক ডিশ ব্যবসায়ী থেকে দেশের মানুষ বেভাবেই হোক তাকে চেনে৷ তার যেমন অনেক সমালোচক আছেন, ভক্তও আছে৷ এটাই তার আসল অপরাধ৷ এখানেই আমাদের শ্রেণি মানসিকতার বর্ণবাদ৷ পুলিশ কর্মকর্তা আসলে তার সেই চরিত্রেরই প্রকাশ ঘটিয়েছেন হিরো আলমকে আটক করে মুচলেকা নিয়ে৷ সংগীত চর্চায় সমাজের খড়গ টপ্পা দমন আন্দোলন ভারতীয় মার্গ সংগীতের প্রধান চারটি ধারার একটি টপ্পা৷ বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুসারে, আঠারো শতকে বাংলায় টপ্পার সূত্রপাত করেন রামনিধি গুপ্ত ওরফে নিধুগুপ্ত৷ শ্রোতাপ্রিয় হলেও রামনিধি গুপ্তের জীবিত অবস্থাতেই ‘ভদ্রসমাজে’ এই গান নিষিদ্ধ হয়েছিল৷ ‘নিধুবাবুর টপ্পা ভদ্রসমাজে গাইতে মানা’ - এমন স্লোগান নিয়ে রক্ষণশীলরা তার বিরুদ্ধে জোটবদ্ধ হয়৷ অশ্লীলতার অভিযোগ এনে এই গান বর্জনের ডাক দেয় তারা৷ সংগীত চর্চায় সমাজের খড়গ ‘বাইজিবাড়ির গান’ ঠুমরি কাজরি, ঠুমরি বা ঠুম্রিতে উত্তর ভারতের লোকসংগীতের প্রভাব বিরাজমান৷ একসময় এই ঠুমরি নিয়েও সমাজের অনেকের আপত্তি ছিল৷ বাইজিবাড়ির গান বলে প্রচলিত থাকায় ভদ্রসমাজে এই গান কার্যত নিষিদ্ধ ছিল এবং যারা গাইতেন তারা বাইজিপাড়ার মানুষ হিসেবেই চিহ্নিত হতেন৷ যদিও পরবর্তীতে কাজরি ও ঠুমরি ভারতীয় ধ্রুপদী সংগীতের অন্যতম শাখায় পরিণত হয়৷ সংগীত চর্চায় সমাজের খড়গ রবীন্দ্র সংগীত গাইতে মানা স্বনামধন্য রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী দেবব্রত বিশ্বাসকেও রবীন্দ্র সংগীত গাওয়া নিয়ে বিপাকে পড়তে হয়েছিল৷ ১৯৬৪ সালে তার দুইটি গান নিয়ে আপত্তি তোলে বিশ্বভারতী মিউজ়িক বোর্ড৷ স্বরলিপি না মানা আর অতিরিক্ত যন্ত্রানুষঙ্গ ব্যবহারের অভিযোগে ১৯৬৯ সালে আরো দুইটি গানকে রীতিমত বাতিল করে তারা৷ রবীন্দ্র সংগীত গেয়ে প্রবল সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন বাংলাদেশে ব্যান্ডশিল্পী মাকসুদও৷ সংগীত চর্চায় সমাজের খড়গ ব্যান্ড সংগীত ‘অপসংস্কৃতি’ আশির দশকে বাংলাদেশে ব্যান্ড সংগীত বিস্তার লাভ করে৷ বর্তমানে জনপ্রিয় হলেও শুরুর দিকে এই ধরনের গান নিয়ে সমাজের এক অংশের ব্যাপক আপত্তি ছিল৷ ব্যান্ড সংগীতকে দেখা হতো ‘পশ্চিমা সংস্কৃতির আগ্রাসন’ বা ‘অপসংস্কৃতি’ বা এমনকি ‘বাজে ছেলেদের’ গান হিসেবেও অভিহিত ছিল৷ তবে তরুণদের মধ্য এই গান ঠিকই জনপ্রিয়তা পায়৷ সংগীত চর্চায় সমাজের খড়গ ‘ভদ্র সমাজে’ নিষিদ্ধ জ্যাজ নিউ অরলিয়েন্সের অ্যাফ্রো-অ্যামেরিকানদের হাত উনিশ-বিশ শতকে জ্যাজ সংগীতের সূচনা ঘটে৷ বর্তমানে এটি গানের জনপ্রিয় একটি ধারা হলেও শুরুর দিকে তা সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য ছিল না৷ বয়স্ক প্রজন্ম জ্যাজকে পুরনো সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের পরিপন্থী হিসেবে বিবেচনা করতেন৷ অনেকে এটিকে সংগীত বলেই মানতেন না৷ জ্যাজ স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর এমন খবরও ছড়ানো হয়েছিল৷ পাবলিক স্কুলগুলোতে এই সংগীত নিষিদ্ধ ছিল৷ সংগীত চর্চায় সমাজের খড়গ ‘ভদ্র সমাজে’ নিষিদ্ধ জ্যাজ নিউ অরলিয়েন্সের অ্যাফ্রো-অ্যামেরিকানদের হাত উনিশ-বিশ শতকে জ্যাজ সংগীতের সূচনা ঘটে৷ বর্তমানে এটি গানের জনপ্রিয় একটি ধারা হলেও শুরুর দিকে তা সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য ছিল না৷ বয়স্ক প্রজন্ম জ্যাজকে পুরনো সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের পরিপন্থী হিসেবে বিবেচনা করতেন৷ অনেকে এটিকে সংগীত বলেই মানতেন না৷ জ্যাজ স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর এমন খবরও ছড়ানো হয়েছিল৷ পাবলিক স্কুলগুলোতে এই সংগীত নিষিদ্ধ ছিল৷