পায়রা ধরতে গিয়ে ভারতের জেলে পাকিস্তানের ছাত্র

title
২ মাস আগে
ভারত-পাকিস্তান সীমান্তের এক ছোট্ট গ্রামে বাড়ি নবম শ্রেণির ছাত্র আব্দুল সামাদের। পাকিস্তানের কাশ্মীরে অবস্থিত ওই গ্রামের নাম তাত্রিনোট। সামাদ পায়রা পুষতেন। গত নভেম্বর মাসে পায়রাগুলিকে খাঁচা থেকে মুক্ত করেছিলেন সামাদ। বিকেলের দিকে কিছু পায়রা ফিরে এলেও কয়েকটি নিরুদ্দেশ ছিল। তাদের খুঁজতে বেরিয়েই সমস্যায় পড়েন সামাদ। পায়রা ধরতে গিয়ে তিনি ঢুকে পড়েন ভারতীয় কাশ্মীরের অংশে। এবং সঙ্গে সঙ্গে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী তাকে আটক করে। ভারতে সামাদের বিরুদ্ধে বেআইনিভাবে সীমান্ত পার করার মামলা দায়ের হয়েছে। তাকে রাখা হয়েছে অমৃতসরের একটি জেলে। এখনো পর্যন্ত সামাদের পরিবার তার সঙ্গে কথা বলতে পারেনি। গরিব গ্রামের মানুষ ওই দিন বিকেলেই খবর পান যে, সামাদ ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন। তারপরেই পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেন তার পরিবার। শান্তির খোঁজে সীমান্তের ওপারে দেশভাগে দেশছাড়া ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর পাকিস্তানের বসবাসরত হিন্দুদের বড় অংশই পাড়ি জমায় ভারতে৷ তারপরও কিছু মানুষ তাদের ভিটেমাটিতেই থেকে যান৷ বর্তমানে দেশটির মোট জনগোষ্ঠীর মাত্র দুই শতাংশ হিন্দু ধর্মাবলম্বী৷ শান্তির খোঁজে সীমান্তের ওপারে নিজ দেশে পরবাসী পাকিস্তানে হিন্দু, আহমদিয়াসহ বিভিন্ন সংখ্যালঘুদের উপর বৈষম্য আর নির্যাতন দিনদিন বেড়ে চলছে৷ মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের অভিযোগ দেশটির ব্লাসফেমি আইনের মূল উদ্দেশ্যই সংখ্যালঘুরা৷ আফগান সীমান্তবর্তী উপজাতি অঞ্চলগুলোসহ বেশ কিছু স্থানে এমনকি জোরপূর্বক ইসলাম ধর্মান্তরের ঘটনাও ঘটেছে৷ শান্তির খোঁজে সীমান্তের ওপারে মোদীর ডাকে সাড়া ভারতের নরেন্দ্র মোদী সরকার প্রতিবেশি দেশগুলোর হিন্দুদের আশ্রয় দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে৷ নতুন নাগরিকত্ব আইন অনুযায়ী, ২০১৫ সালের আগে আসা হিন্দুরা সহজেই নাগরিকত্ব পাবেন ভারতে৷ ছবিতে একজন শরণার্থীর ঘরের দেয়ালে নরেন্দ্র মোদীর পোস্টার ঝুলছে৷ শান্তির খোঁজে সীমান্তের ওপারে শরণার্থী স্রোত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৯ সালের মার্চ পর্যন্ত ১৫ মাসে ১৬ হাজার ১২১ জন পাকিস্তানের নাগরিক ভারতে আশ্রয়ের আবেদন করেছেন৷ গত কয়েক বছরে আশ্রয়প্রার্থীদের সংখ্যা শত থেকে হাজারে পৌঁছেছে৷ শান্তির খোঁজে সীমান্তের ওপারে উগ্র হিন্দুদের অভ্যর্থনা শরণার্থীদের এই স্রোতকে নিজেদের প্রভাব বাড়ানোর কাজে লাগাচ্ছে উগ্র হিন্দু গোষ্ঠীগুলো৷ যেমন বিশ্ব হিন্দু পরিষদ শরণার্থী শিবিরগুলোতে তাদের ধর্মীয় শিক্ষাগুরুদের নিয়োগ দিয়েছে৷ ক্ষমতাসীন দল বিজেপির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ এই দলটির বিরুদ্ধে মুসলিম সংখ্যালঘুদের উপর সহিংস কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে৷ শান্তির খোঁজে সীমান্তের ওপারে কথা বলতে মানা শরণার্থীদের গণমাধ্যমে কথা বলতে বারণ করেছেন বিশ্ব হিন্দু পরিষদের সদস্যরা৷ সেখানে বসবাসরতদের একজন ধর্মবীর সোলঙ্কি বলেন, ‘‘তারা আমাদের সাহায্য করতে চায়৷’’ নিজের অনুভূতির কথা জানিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে তিনি বলেন, ‘‘আমরা এখানে নতুন করে বাঁচতে চেষ্টা করছি৷’’ শান্তির খোঁজে সীমান্তের ওপারে একই জীবন ভারতীয় মুসলিমদের পাকিস্তানে সংখ্যালঘু হিন্দুদের মতোই পরিস্থিতি ভারতের মুসলিমদের৷ মোদী সরকারের নতুন নাগরিকত্ব আইন ভারতে তাদের অবস্থান আরো কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে ফেলে দিয়েছে৷ যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে ইন্টারন্যাশনাল ফ্রিডম কমিশনের এক শুনানিতে ভারত বিশেষজ্ঞ এবং শিক্ষাবিদরা এ নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন৷ এই আইনে মুসলিম সংখ্যালঘুরা নাগরিকত্ব হারাতে পারেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন৷ সামাদের মামা আরবাব আলি জানিয়েছেন, সামাদ গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকে তারা একাধিকবার পাকিস্তান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন কিন্তু সেখান থেকে কোনো সাহায্য মেলেনি। তারা একবার সামাদের গলার আওয়াজ শুনতে চান। কিন্তু সেই ব্যবস্থাটুকুও তাদের করে দেয়া হয়নি। ওয়াশিংটনে উড্রো উইলসন সেন্টার ফর স্কলারসের দক্ষিণ এশিয়া বিশেষজ্ঞ মাইকেল কুগেলম্যান ডিডাব্লিউকে জানিয়েছেন, ''এই ধরনের মামলায় সাধারণত বন্দিকে ছেড়ে দেয়া হয়। কিন্তু তার জন্য অনেকটা সময় লেগে যায়। সে জন্যই ঠিক সংস্থার কাছে দ্রুত পৌঁছানো জরুরি।'' ভারতের মানবাধিকার কর্মী রাহুল কাপূর আব্দুল সামাদের ঘটনাটির কথা জেনে একটি অনলাইন পিটিশনের ব্যবস্থা করেন। গোটা দেশ থেকে সই সংগ্রহ করে তিনি ওয়াকিবহাল কর্মকর্তাদের কাছে পাঠিয়েছিলেন। তারই জেরে ভারতে পাকিস্তানের দূতাবাসের কর্মীরা সামাদের সঙ্গে গিয়ে দেখা করে আসতে পেরেছেন। গত মার্চ মাসে তারা গেছিলেন। ১৯৭৪ সালে ভারত এবং পাকিস্তানের মধ্যে একটি চুক্তি সই হয়েছিল। সেখানে এধরনের ভুল করে সীমান্ত পার করা মানুষদের হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত হয়েছিল। হস্তান্তর হয়। কিন্তু তার জন্য বহু সময় লেগে যায়। বস্তুত, এই মুহূর্তে পাকিস্তানের জেলে ভারতের এমন ৬২৮ জন বন্দি আছেন। অন্যদিকে ভারতের জেলে বন্দি পাকিস্তানের ২৮২ জন নাগরিক। এদের অধিকাংশই মাছ ধরতে গিয়ে সমুদ্রে সীমান্ত পার করে ফেলেছিলেন। বিশেষজ্ঞদের অধিকাংশই বলছেন, সব ঠিক থাকলে সামাদ মুক্তি পেয়ে যাবেন। কিন্তু কতদিনে তিনি মুক্তি পান, সেটাই চিন্তার। বস্তুত, ভারত এবং পাকিস্তানের মধ্যে সম্পর্ক এতটাই তলানিতে গিয়ে পৌঁছেছে যে, এই ধরনের হস্তান্তরে বহু সময় লেগে যায়। হারুন জানজুয়া/এসজি