‘‘হিরো আলম যে ঠিক করছেন না, এটা তো কাউকে বলতে হবে’’

title
১০ দিন আগে
এই সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঝড় তুলেছেন আলোচিত-সমালোচিত অভিনেতা আশরাফুল আলম সাঈদ, যিনি হিরো আলম নামে পরিচিত৷ ধরে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের পর তিনি কিছু অভিযোগ তুলেছেন, যা নিয়ে নানা ধরনের প্রশ্নের মুখে পুলিশ৷ তিনি আর রবীন্দ্র সংগীত, নজরুল সংগীত গাইবেন না এমন মুচলেকা কি পুলিশ তার কাছ থেকে নিতে পারে? এসব নিয়ে ডয়চে ভেলের সঙ্গে কথা বলেছেন পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক ও সংসদ সদস্য নূর মোহাম্মদ৷ ডয়চে ভেলে: হিরো আলমকে ডিবি কার্যালয়ে ডেকে তার কাছ থেকে মুচলেকা নেওয়া হয়েছে যে, তিনি রবীন্দ্র সংগীত, নজরুল সংগীত গাইবেন না৷ পুলিশ কি এমন মুচলেকা নিতে পারে? নূর মোহাম্মদ : বাংলাদেশে, আমাদের মত দেশে পুলিশ কোন কাজটা করে না বলেন? সব কাজই পুলিশ করে৷ সব কিছুতেই পুলিশকে সম্পৃক্ত করা হয়৷ রাস্তায় যদি ময়লা পড়ে থাকে, যেটা পুলিশের করার কথা না সেটাও পুলিশকে করতে হয়৷ সবকিছু মিলিয়েই তো পুলিশ কাজ করে৷ এখানে যে বিষয়টা নিয়ে বললেন সেটা নিয়ে অনেক আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে৷ আমি হিরো আলমের কখনও কিছু দেখি নাই৷ টিভিতে বা কোথাও হয়ত দুই একবার কিছু দেখেছি মনে নেই৷ তার কর্মকাণ্ড আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম কিভাবে দেখছে? এটা আমার কাছে নিছক একটা ফাজলামি মনে হচ্ছে না৷ সমাজ সংস্কৃতি নিয়ে যারা কাজ করেন এখানে তাদের কথা বলা উচিৎ৷ এটা বিকৃত একটা অবস্থান৷ যেহেতু এখানে কেউ কিছু বলছে না, তাহলে পুলিশ যদি হস্তক্ষেপ করে তাহলে অসুবিধাটা কী? আমি বিষয়টাকে ওইভাবে দেখি৷ হিরো আলমকে ডেকে বলা হয়েছে, তোমার চেহারা কখনও আয়নায় দেখেছ, তোমার নামের আগে থেকে হিরো শব্দটা বাদ দিয়ে দাও৷ এটা কি তার ব্যক্তি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ বা মানবাধিকারের লংঘন নয়? একটা মানুষের চেহারা নিয়ে তো কেউ কখনও কথা বলতে পারে না৷ এটা করা উচিৎও না৷ তবে আমি যেটা মনে করি, তার অবস্থানটা বিকৃত৷ পুলিশই হোক বা প্রশাসনই হোক, যেকোনো তরফ থেকে তার কাছে মেসেজটা দেওয়া দরকার যে তোমার এগুলো করা উচিৎ না৷ করলে সঠিকভাবে কিছু কর৷ কেউ যখন বলছে না, তখন পুলিশ বলছে৷ পুলিশকে দিয়ে হয়ত কেউ বলাচ্ছে৷ এখানে তো আমি খারাপ কিছু দেখি না৷ তবে কারও চেহারা বা স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলা উচিৎ না৷ আর তিনি যেভাবে ভিডিও বানাচ্ছেন সেটা কিন্তু সমাজের সচেতন মানুষ ভালোভাবে নিচ্ছেন না৷ সবাই যেটা বলছে, তার ব্যক্তি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে৷ তার মানে কী, আপনি যখন যা খুশি তাই করবেন, কেউ বাধা দিবে না? কেউ যদি বাধা দিয়ে না থাকে, আর পুলিশ গিয়ে সেই কাজটা করে তাতে তো পুলিশের কোন অন্যায় দেখি না৷ তার সঙ্গে পুলিশের আচরণ বর্ণবাদী আচরণের পর্যায়ে পড়ে কিনা? চেহারা বা স্বাস্থ্য নিয়ে তো কারও কথা বলা উচিৎ না৷ এটা নিতান্তই ব্যক্তিগত ব্যাপার৷ এটা নিয়ে যদি কেউ বলে থাকেন সেটা সঠিক কাজ হয়নি৷ পুলিশের কাজটা কী? আমরা মোটা দাগে যদি দেখি, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করা এই তো পুলিশের কাজ৷ এর বাইরে সমাজের ভালো হবে, এমন কোনো কাজে যদি কেউ পুলিশকে লাগায় সেটা তো ভালো৷ হিরো আলম সাংস্কৃতিক অঙ্গনটাকে যেভাবে বিকৃত করছে, এগুলো নিয়ে তো সাংস্কৃতিক অঙ্গনের লোজনেরই কথা বলা উচিৎ ছিল৷ যেহেতু কেউ বলছে না, সে কারণে হয়ত পুলিশ নিজ উদ্যোগে বলছে বা কেউ পুলিশকে দিয়ে বলাচ্ছে৷ আপনি বর্ণবাদী আচরণের কথা বলেন বা মানবাধিকারের কথা বলেন, ব্যক্তিগত অধিকারে হস্তক্ষেপের কথা বলেন, আমাদের মত দেশে আমরা যখন এই প্রশ্নগুলো করি, আসল প্রেক্ষাপটটা দেখে প্রশ্নগুলো করা উচিৎ৷ আমি একটা কথাই বলব যে, তাকে কেন ডাকল? কেন জিজ্ঞাসাবাদ করল? কেন তার সঙ্গে কথা বলল? কারণ একটাই, বিকৃত একটা অবস্থানে তিনি দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন কিন্তু কেউ কিছু বলছে না, শুধু পুলিশ তাকে একটু জিজ্ঞাসাবাদ করেছে৷ এখানে যদি পুলিশের কোন বাড়াবাড়ি হয়ে থাকে ওই দায়ী পুলিশ সদস্যদের বিচারের আওতায় আনা উচিৎ৷ পুলিশ যদি হস্তক্ষেপ করে তাহলে অসুবিধাটা কী: নূর মোহাম্মদ হিরো আলমের জিজ্ঞাসাবাদ নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে অনেক সমালোচনা হচ্ছে৷ এ ব্যাপারে আপনি কী বলবেন? তিনি যে অভিযোগ করছেন, সেটা যদি সত্যি হয়ে থাকে তাহলে অপরাধ হয়েছে৷ যিনি করেছেন বিভাগীয়ভাবে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা উচিৎ কেন তিনি এসব কথা বলেছেন? তারা কতটুকু কী করেছেন, সেটা যারা সুপারভাইজিং অফিসার আছেন তারা দেখভাল করে করবেন৷ যদি তার সঙ্গে এমন আচরণ হয়ে থাকে, তাহলে আমি বলব, এটা ঠিক হয়নি, সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিৎ৷ রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের গান গাওয়ার ব্যাপারে কি পুলিশের কাছে কোন নির্দেশনা আছে? অবশ্যই না৷ এটা তো পুলিশের কাজ না৷ আমরা ছোট বেলা থেকেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বা নজরুল ইসলামের কবিতা, গান শুনে আসছি, দেখে আসছি, পড়ে আসছি৷ তাদেরকে নিয়ে যখন অশিক্ষিত মূর্খ মানুষই বলব, যিনি বিকৃত করেন সেটা কেউ না বললেও পুলিশ যদি বলে এটা কি অপরাধ? আমি তো মনে করি না৷ আমাদের উকিল সাহেবরা বা অনেকেই দেখি হাইকোর্টে রিট করেন, এই বিকৃতির জন্য তারাও তো বলতে পারতেন৷ বলেনি কেউ৷ পুলিশ বলেছে৷ এখন পুলিশ কি নিজের উদ্যোগের বলেছে না কেউ তাকে বলতে বলেছে সেটা তো আমি জানি না৷ কেউ গান গাইলেই সেটা শুনতে হবে এমন বাধ্যবাধকতা তো নেই, তাহলে হিরো আলমের অপরাধ কী? আমাদের প্রচলিত আইনে আমি কোন অপরাধ দেখি না৷ কিন্তু এখানে একটা বিষয় আছে, কোন কিছু বিকৃত করা কিন্তু অপরাধ৷ রবীন্দ্রনাথের গান তো নির্দিষ্ট একটা সুরেই গাইতে হয়৷ এটা যদি কেউ বিকৃত করে তাহলে তাকে কী আইনের আওতায় আনতে হবে না? আমি এটাই মনে করি৷ হিরো আলম অভিযোগ করেছেন, তার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হয়েছে৷ পুলিশ কী এভাবে কারো সঙ্গে দুর্ব্যবহার করতে পারে? যেহেতু পুলিশ একটা শৃঙ্খল বাহিনী, সেখানে তার সঙ্গে যদি কেউ দুর্ব্যবহার করেন তাহলে তিনি অভিযোগ করতে পারেন৷ তখন বাহিনী থেকে বিষয়টার তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে৷ পুলিশকে একটা নিয়মের মধ্যে চলতে হয়৷ কারো সঙ্গে দুর্ব্যবহার করার সুযোগ নেই৷ কোন ব্যক্তিকে ডেকে আনা বা জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মাঠ পর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের যথাযথ প্রশিক্ষণ কী দেওয়া হয়? পুলিশকে শুরু থেকেই মৌলিক প্রশিক্ষণের পর দফায় দফায় প্রশিক্ষণ নিতে হয়৷ সেখানে তাদের ব্যবহার কেমন হবে? কিভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করবে সেগুলো তো তাদের শেখানো হয়৷ সবকিছু কিন্তু লিখিত এবং ব্যবহারিকভাবেই তাদের জানানো হয়, শেখানো হয়৷ সব সময়ই বলা হয়, পুলিশ দ্বারা যেন কেউ নিগৃহীত না হয়৷ কারণ পুলিশের সুযোগ বেশি৷ এজন্য বারবার তাদের মাথায় এটা ঢুকানো হয়৷ তারা কোন অবস্থাতেই মানুষের সঙ্গে খারাপ আচরণ করতে পারবে না৷ কারণ পুলিশের হাতে অস্ত্র আছে, পোশাক আছে৷ ইচ্ছা করলেই কিন্তু তারা অপব্যবহার করতে পারে৷ এজন্য তাদের কাজকর্ম তদারক করার জন্য অনেকগুলো লেয়ার আছে৷ যেন কোথাও কোন ব্যাত্যয় না ঘটে৷ হিরো আলম ইস্যুতে সামাজিক মাধ্যমে পুলিশের বিরুদ্ধে একটা নেতিবাচক আলোচনা হচ্ছে, এটা থেকে বের হতে পুলিশ কী করতে পারে? আপনারা যদি পুলিশকে একটু সাপোর্ট করেন... দেখেন হিরো আলম যে কাজটা করে বেড়াচ্ছে, তার মত একজন মানুষ সাংস্কৃতিক অঙ্গনটাকে নষ্ট করছে৷ এটা নিয়ে কি আপনাদের লেখা উচিৎ না? বলা উচিৎ না? সে যা করছে, আসলে সে এই কাজগুলো করার যোগ্য কিনা? এই প্রশ্নটাতো করা উচিৎ? সংগীত চর্চায় সমাজের খড়গ টপ্পা দমন আন্দোলন ভারতীয় মার্গ সংগীতের প্রধান চারটি ধারার একটি টপ্পা৷ বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুসারে, আঠারো শতকে বাংলায় টপ্পার সূত্রপাত করেন রামনিধি গুপ্ত ওরফে নিধুগুপ্ত৷ শ্রোতাপ্রিয় হলেও রামনিধি গুপ্তের জীবিত অবস্থাতেই ‘ভদ্রসমাজে’ এই গান নিষিদ্ধ হয়েছিল৷ ‘নিধুবাবুর টপ্পা ভদ্রসমাজে গাইতে মানা’ - এমন স্লোগান নিয়ে রক্ষণশীলরা তার বিরুদ্ধে জোটবদ্ধ হয়৷ অশ্লীলতার অভিযোগ এনে এই গান বর্জনের ডাক দেয় তারা৷ সংগীত চর্চায় সমাজের খড়গ ‘বাইজিবাড়ির গান’ ঠুমরি কাজরি, ঠুমরি বা ঠুম্রিতে উত্তর ভারতের লোকসংগীতের প্রভাব বিরাজমান৷ একসময় এই ঠুমরি নিয়েও সমাজের অনেকের আপত্তি ছিল৷ বাইজিবাড়ির গান বলে প্রচলিত থাকায় ভদ্রসমাজে এই গান কার্যত নিষিদ্ধ ছিল এবং যারা গাইতেন তারা বাইজিপাড়ার মানুষ হিসেবেই চিহ্নিত হতেন৷ যদিও পরবর্তীতে কাজরি ও ঠুমরি ভারতীয় ধ্রুপদী সংগীতের অন্যতম শাখায় পরিণত হয়৷ সংগীত চর্চায় সমাজের খড়গ রবীন্দ্র সংগীত গাইতে মানা স্বনামধন্য রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী দেবব্রত বিশ্বাসকেও রবীন্দ্র সংগীত গাওয়া নিয়ে বিপাকে পড়তে হয়েছিল৷ ১৯৬৪ সালে তার দুইটি গান নিয়ে আপত্তি তোলে বিশ্বভারতী মিউজ়িক বোর্ড৷ স্বরলিপি না মানা আর অতিরিক্ত যন্ত্রানুষঙ্গ ব্যবহারের অভিযোগে ১৯৬৯ সালে আরো দুইটি গানকে রীতিমত বাতিল করে তারা৷ রবীন্দ্র সংগীত গেয়ে প্রবল সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন বাংলাদেশে ব্যান্ডশিল্পী মাকসুদও৷ সংগীত চর্চায় সমাজের খড়গ ব্যান্ড সংগীত ‘অপসংস্কৃতি’ আশির দশকে বাংলাদেশে ব্যান্ড সংগীত বিস্তার লাভ করে৷ বর্তমানে জনপ্রিয় হলেও শুরুর দিকে এই ধরনের গান নিয়ে সমাজের এক অংশের ব্যাপক আপত্তি ছিল৷ ব্যান্ড সংগীতকে দেখা হতো ‘পশ্চিমা সংস্কৃতির আগ্রাসন’ বা ‘অপসংস্কৃতি’ বা এমনকি ‘বাজে ছেলেদের’ গান হিসেবেও অভিহিত ছিল৷ তবে তরুণদের মধ্য এই গান ঠিকই জনপ্রিয়তা পায়৷ সংগীত চর্চায় সমাজের খড়গ ‘ভদ্র সমাজে’ নিষিদ্ধ জ্যাজ নিউ অরলিয়েন্সের অ্যাফ্রো-অ্যামেরিকানদের হাত উনিশ-বিশ শতকে জ্যাজ সংগীতের সূচনা ঘটে৷ বর্তমানে এটি গানের জনপ্রিয় একটি ধারা হলেও শুরুর দিকে তা সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য ছিল না৷ বয়স্ক প্রজন্ম জ্যাজকে পুরনো সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের পরিপন্থী হিসেবে বিবেচনা করতেন৷ অনেকে এটিকে সংগীত বলেই মানতেন না৷ জ্যাজ স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর এমন খবরও ছড়ানো হয়েছিল৷ পাবলিক স্কুলগুলোতে এই সংগীত নিষিদ্ধ ছিল৷ সংগীত চর্চায় সমাজের খড়গ ‘ভদ্র সমাজে’ নিষিদ্ধ জ্যাজ নিউ অরলিয়েন্সের অ্যাফ্রো-অ্যামেরিকানদের হাত উনিশ-বিশ শতকে জ্যাজ সংগীতের সূচনা ঘটে৷ বর্তমানে এটি গানের জনপ্রিয় একটি ধারা হলেও শুরুর দিকে তা সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য ছিল না৷ বয়স্ক প্রজন্ম জ্যাজকে পুরনো সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের পরিপন্থী হিসেবে বিবেচনা করতেন৷ অনেকে এটিকে সংগীত বলেই মানতেন না৷ জ্যাজ স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর এমন খবরও ছড়ানো হয়েছিল৷ পাবলিক স্কুলগুলোতে এই সংগীত নিষিদ্ধ ছিল৷