রাশিয়ার যুদ্ধবন্দিদের মুখোমুখি ডিডাব্লিউ

title
২ দিন আগে
ইউক্রেনের প্রশাসন সংবাদমাধ্যম হিসেবে ডিডাব্লিউকেই প্রথম এমন ডিটেনশন ক্যাম্পে ঢোকার অনুমতি দিয়েছে। তবে বেশ কিছু শর্ত আরোপ করা হয়েছিল। বলা হয়েছিল, ডিটেনশন ক্যাম্পের অবস্থান জানানো যাবে না। যুদ্ধাপরাধে দোষী সাব্যস্ত অথবা বিচারাধীন বন্দিদের সঙ্গে কথা বলা যাবে না। কেবলমাত্র সাধারণ যুদ্ধবন্দিদের সঙ্গেই কথা বলা যাবে। কিন্তু দেখানো যাবে না তাদের মুখ। ইউক্রেনে পৌঁছে জানতে পারলাম, ঠিক কী ঘটছে প্রশস্থ একটি সেলে পাশাপাশি সাতজন বন্দিকে রাখা হয়েছে। সাংবাদিককে দেখে তারা অবাক হননি। কারণ, রেডক্রস, জাতিসংঘ-সহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার কর্মীরা নিয়মিত তাদের সঙ্গে এসে দেখা করছেন। গোটা সাক্ষাৎকার পর্বেই ডিডাব্লিউয়ের প্রতিনিধির সঙ্গে একজন জেলের কর্মী ছিলেন। কার সাক্ষাৎকার নেওয়া হবে, তাকে জানাতে হচ্ছিল। মোট চারজন বন্দির বয়ান রেকর্ড করেছে ডিডাব্লিউ। প্রথমজনের নাম রোমান। খারকিভ অঞ্চলে লড়াই করার সময় আহত হন রোমান। সেখানেই ইউক্রেনের বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন তিনি। রোমান জানিয়েছেন, প্রথম যখন তাদের ডাকা হয়, বলা হয়েছিল, মানবাধিকার রক্ষার স্বার্থেই তাদের ইউক্রেনে যেতে হবে। এর কয়েকদিনের মধ্যেই তাকে যুদ্ধের প্রান্তরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। খুব বেশি তথ্য তার কাছে ছিল না। ইউক্রেনে এসে তিনি বুঝতে পারেন, যুদ্ধের ময়দানে এসে পড়েছেন। আহত হওয়ার পরে ইউক্রেনের সেনা তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছে বলে জানিয়েছেন রোমান। বিজ্ঞাপন দেখে লড়াইয়ের ময়দানে আরেক যুদ্ধবন্দির নাম আরটিওম। তিনি জানিয়েছেন, খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দেখে তিনি লড়াইয়ে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। যুদ্ধ নয়, সাক্ষাৎকার পর্বে তিনি বার বার 'স্পেশাল মিলিটারি অপারেশন' শব্দটি ব্যবহার করেছেন। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুটিনও এই শব্দটিই ব্যবহার করছেন। এই লড়াইকে তিনি যুদ্ধ বলতে নারাজ। বোমা বর্ষণের মাঝেই যে হাসপাতালে চলে চিকিৎসা দরজায় চড়ে ‘নরক’ থেকে হাসপাতালে যুদ্ধাহত সৈনিক ইগর বলছিলেন, ‘‘আমরা নরক থেকে এখানে এসেছি৷’’ বাখমুতের এই হাসপাতালে তিনি এসেছেন বাঁচার আশায়৷ হাতে গোনা কয়েকজন ডাক্তার এবং প্যারামেডিক্স প্রাণপণ লড়ছেন তাদের বাঁচাতে৷ হাসপাতালে আধুনিক যন্ত্রপাতি বলতে গেলে কিছুই নেই৷ পর্যাপ্ত স্ট্রেচারও না থাকায় ওপরের ছবির মতো কাঠের দরজায় তুলে আনতে হচ্ছে আহত সৈন্যদের৷ বোমা বর্ষণের মাঝেই যে হাসপাতালে চলে চিকিৎসা সেকেন্ড-হ্যান্ড অ্যাম্বুলেন্স এমনকি যুদ্ধক্ষেত্র থেকে আহত সৈন্যদের নিয়ে আসার জন্য ভালো কোনো অ্যাম্বুলেন্সও নেই৷ জার্মানি এবং পোল্যান্ডের তৈরি কয়েকটি সেকেন্ড-হ্যান্ড অ্যাম্বুলেন্সই ভরসা বাখমুতের এই হাসপাতালের৷ বোমা বর্ষণের মাঝেই যে হাসপাতালে চলে চিকিৎসা ক্যানাডা থেকে ইউক্রেনে ছবির এই নারীর নাম এলেনা বুলাখতিনা৷ রুশ বংশোদ্ভূত এই ক্যানাডিয়ান কাজ করছেন পিরোগভ ফার্স্ট ভলান্টিয়ার মোবাইল হসপিট্যালে৷ ভ্রাম্যমাণ হাসপাতালটির মূল কাজ লুহানস্ক অঞ্চলের পোপসানা শহরের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে আহত সৈনিকদের বাখমুতের হাসপাতালে নিয়ে আসা৷ আহতদের সব চিকিৎসা হয় না এখানে৷ প্রাথমিক চিকিৎসায় রক্তপাত বন্ধ করে, কিছুটা সুস্থ করে সব রোগীকে পাঠিয়ে দেয়া হয় ইউক্রেনের পশ্চিমাঞ্চলের বড় কোনো হাসপাতালে৷ বোমা বর্ষণের মাঝেই যে হাসপাতালে চলে চিকিৎসা ‘এত রোগী আসবে ভাবিনি’ বুলাখতিনার ‘বস’ সভেতলানা ড্রুজেনকো জানালেন এত আহত সৈনিকের চিকিৎসা দিতে গিয়ে তারা হিমশিম খাচ্ছেন, ‘‘যুদ্ধ শুরুর পর আমরা যখন কাজ শুরু করি, তখনও ভাবিনি এত লোক আহত হয়ে আসবে৷ এখন যে হারে আসছে, সংখ্যাটা সত্যিই বিশাল৷ অনেক মানুষ মারা যাচ্ছে, সব শহরেই মারা যাচ্ছে মানুষ৷’’ বোমা বর্ষণের মাঝেই যে হাসপাতালে চলে চিকিৎসা ‘পোপাসনা এখন ধ্বংসস্তূপ‘ আহত সৈন্য ইগরের যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা খুব ভয়াবহ৷ বলছিলেন, ‘‘ওরা (রুশ বাহিনী) ভূমি থেকে এবং বিমান থেকে হামলা চালিয়েছে, সব জায়গায় বোমা ফেলছে, দিনে-রাতে হামলা চালাচ্ছে৷ পোপাসনা একেবারে ধ্বংস হয়ে গেছে৷’’ বোমা বর্ষণের মাঝেই যে হাসপাতালে চলে চিকিৎসা আহত আলেসান্দ্রোর স্বস্তি যুদ্ধাহত সৈনিক আলেসান্দ্রোর পরিবার যুদ্ধ শুরুর পরই ইউক্রেন ছেড়ে চলে গেছে পোল্যান্ডে৷ সেখানে তারা নিরাপদে আছেন৷ হাসপাতালে নিজের শরীরের ব্যথা ভুলে সন্তানের সঙ্গে কথা বলছেন আলেসান্দ্রো৷ বাহিনীতে যোগ দেওয়ার পর প্রথম দনেৎস্ক অঞ্চলে তাকে লড়াইয়ের জন্য পাঠানো হয়। সেখানে রাশিয়ার মদতপুষ্ট বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সঙ্গে যোগাযোগ হয় তার। মাত্র কয়েকদিনের মধ্যে টি-৭২ ট্যাঙ্ক চালানো শিখে নেন তিনি। কিন্তু শেষপর্যন্ত ট্যাঙ্ক রক্ষা করতে পারেননি তিনি। ইউক্রেনের বাহিনী তার ট্যাঙ্ক ধ্বংস করে দেয়। বন্দি হন আরটিওম। তার বক্তব্য, বন্দি হওয়ার পর ইউক্রেনের সেনা তাকে খাবার দিয়েছে, সিগারেট দিয়েছে। তার কথায়, ''এখানে এসে এখনো পর্যন্ত কোনো ফ্যাশিস্ট দেখতে পাচ্ছি না। অথচ আমাদের সে কথা বলেই পাঠানো হয়েছিল।'' রাশিয়ার সেনাকে তিনি লুটেরা এবং হত্যাকারী বলে বর্ণনা করেছেন। বন্দিশিবিরের চিত্র প্রতিটি সেল পুরনো ফার্নিচার দিয়ে সাজানো। সেলগুলি পুরনো কিন্তু পরিষ্কার। সেলের মাঝখানে একটি বড় টেবিল রাখা। সেখানে প্লাস্টিকের প্লেট। স্টিলের কাঁটা, চামচও আছে সেখানে। গার্ডরা জানিয়েছেন, নিরাপত্তার কারণে সাধারণত জেলে স্টিলের কাঁটা চামচ রাখা হয় না। কিন্তু যুদ্ধবন্দিদের সেলে তা দেওয়া হয়েছে। যুদ্ধবন্দিরা মারপিট করেন না। তারা অপেক্ষা করছেন বন্দি প্রত্যার্পণের জন্য। প্রতিদিন বিটরুট দিয়ে তৈরি সুপ, রুটি, এবং ডালিয়া জাতীয় খাবার দেওয়া হয় তাদের। পতাকা দেখে বুঝলাম ইউক্রেন পাশের সেলে বছর বিশেকের তিন তরুণ ছিলেন। তাদের খাটের পাশে টেবিলের উপর স্তূপীকৃত বই। বন্দিরা জানিয়েছেন, তারা গোয়েন্দা উপন্যাস পড়তে ভালোবাসেন। তাই তাদের জন্য ওই বইগুলি নিয়ে আসা হয়েছে। ওই বন্দিদের মধ্যে একজনের নাম দিমিত্রি। তিনি জানিয়েছেন, তাকে যে ইউক্রেন পাঠানো হচ্ছে, তিনি জানতেন না। ফেব্রুয়ারির ২৪ তারিখ তারা রাশিয়া থেকে রওনা হয়েছিলেন। ইউক্রেনে ঢোকার পর পতাকা দেখে তারা বুঝতে পারেন যে অন্য দেশে পৌঁছে গেছেন। কম্যান্ডারকে তারা প্রশ্ন করেছিলেন, কেন ইউক্রেনে নিয়ে আসা হয়েছে। কম্যান্ডার জানিয়েছিলেন, অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন করা যাবে না। চেরনিহিভ অঞ্চলে লড়াই করতে গেছিলেন দিমিত্রি। সেখানে তার ট্যাঙ্ক আক্রান্ত হয়। ২৭ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনের সেনার কাছে আত্মসমর্পন করেন তিনি। বন্দিদের সঙ্গে কথা বলার সময় গার্ডরা থাকলেও তারা দূরত্ব বজায় রাখছিলেন। কী কথা হচ্ছে, তা তারা শুনতে পারছিলেন না। ডিডাব্লিউয়ের মনে হয়নি, গার্ডদের চাপে এমন কথা বলছেন বন্দিরা। গ্রাম থেকে বেরিয়ে যান চতুর্থ বন্দির নাম ওলেগ। গত মার্চ মাসে তিনি সেনা বাহিনীতে চুক্তি নবীকরণ করেন। গার্ডদের প্রভাব যাতে কোনোভাবেই তার উপর না পড়ে, সে কারণে একটি আলাদা ঘরে তার সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। ওলেগ জানিয়েছেন, ইউক্রেনে পাঠানোর আগে তাদের বলা হয়েছিল, সেখানে জাতীয়তাবাদীরা সাধারণ মানুষের উপর অত্যাচার চালাচ্ছে। তাদের উদ্ধার করতেই ইউক্রেনে যেতে হবে। ইউক্রেনের গ্রামে পৌঁছে ওলেগের মনে হয়, সেখানে কোনো জাতীয়তাবাদী নেই। গ্রামের মানুষ তাদের স্বাগতও জানাননি, উল্টে বলেছেন, ''বেরিয়ে যান এখান থেকে।'' ওলেগ জানিয়েছেন, চুক্তি নবীকরণের সময় তাদের বলা হয়েছিল, আপাতত শুধু ট্রেনিং দেওয়া হবে। যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হবে না। কিন্তু মাত্র তিনদিনের মধ্যে তাকে খারকিভ অবরোধ করতে পাঠানো হয়। সেখানে কয়েকদিন থাকার পর বাহিনী রাশিয়া ফিরে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু কম্যান্ডার রাজি হননি। কিন্তু এর কয়েকদিনের মধ্যে কম্যান্ডারের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তারপরেই তাদের বাহিনী ইউক্রেনের সেনার হাতে ধরা পড়ে যায়। চারজন বন্দির সঙ্গে কথা বললেও আরো অনেক বন্দিকে দেখেছে ডিডাব্লিউ। তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টির দিকেও নজর রাখা হচ্ছে। ডিটেনশন ক্যাম্পে নিয়মিত মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের পাঠানো হচ্ছে। ডিডাব্লিউ থাকাকালীনও মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা এসেছিলেন। আন্না ফিল/এসজি