সারের দামে নৈরাজ্য, সংকটে কৃষক

title
১১ দিন আগে
কৃষকরা বলছেন ডিজেলের দাম আগেই বেড়েছে। এখন সারের বাজারে যে নৈরাজ্য শুরু হয়েছে তাদের ধান চাষ করা অনেক কঠিন হয়ে পড়বে। আর কৃষি উৎপাদন গবেষকেরা বলছেন, এর কারনে ধানের উৎপাদন কমে গিয়ে চালের আমদানি বাড়বে। আর কৃষকও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তবে কৃষি মন্ত্রণালয় বলছে কৃষকদের মধ্যে ইউরিয়া সার অকারণে বেশি ব্যবহারের প্রবণতা আছে। এই দাম বাড়ার কারণে ইউরিয়ার অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার কমবে। তাতে ফসল উৎপাদনে কোনো বাধার সৃষ্টি হবেনা। কৃষক ও ডিলাররা যা বলছেন: বরিশালের বানারিপাড়া উপজেলার জম্মুদ্বীপ গ্রামের কৃষক ইয়ার হোসেন পাঁচ বিঘা জমিতে ধান চাষ করেন। সামনে ইরি-বোরো ধানের আবাদ করবেন তিনি। কিন্তু সারের দাম বাড়ায় তিনি চিন্তায় পড়ে গেছেন। তিনি বলেন,"এক বিঘা জমিতে চাষ করতে দেড় থেকে দুই হাজার টাকার সার লাগে। এর মধ্যে ইউরিয়া কয়েকবার দিতে হয়। এর পর সেঁচ দিতে হয়। আরো অনেক খরচ আছে। এবার খরচ উঠে আসবে কী না সন্দেহ। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো ইউরিয়ার দাম বাড়ানোর পর অন্য সারের দামও বাড়িয়ে দিয়েছেন ডিলারেরা।” ‘‘এবার খরচ উঠে আসবে কি না সন্দেহ’’ – ইয়ার হোসেন রংপুর সদর উপজেলার কামরুজ্জামান বকুল এক একর জমিতে আমন ধানের চাষ করবেন। তিনি বলেন,"দাম বাড়ার ঘোষণা আসার পর পরই ডিলারেরা ইউরিয়া সারের গুদাম খালি করে ফেলে বেশি দামে বিক্রি করবে বলে। আর অন্য সারের দামও একই সঙ্গে বেড়ে গেছে সরকার না বাড়ালেও। কৃষকেরা সার নিয়ে আতঙ্কে আছেন।” বানারীপাড়া বাজারের ডিলার কামাল হোসেন বিপ্লব নিজে অন্য সারের দাম বেশি নেয়ার কথা স্বীকার না করলেও অন্যরা যে নিচ্ছে তা তিনি স্বীকার করেন। তিনি বলেন,"যেখানে চাহিদা বেশি সেখানে ডিলারেরা অন্য সারের দামও বাড়িয়ে দিয়েছে। কেজি প্রতি তারা তিন-চার টাকা বেশি নিচ্ছেন।” ১ আগস্ট থেকে ইউরিয়া সারের কেজিতে ছয় টাকা বাড়তি দাম কার্যকর হয়েছে। এখন প্রতি কেজির দাম খুচরা পর্যায়ে ২২ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। আগে ছিল ১৬ টাকা। ডিলার পর্যায়ে আগে দাম ছিলো ১৪ টাকা। এখন হয়েছে ২০ টাকা। আর সরকার দাম না বাড়লেও এখন দেশের বিভিন্ন এলাকায় ১৫ টাকার পটাশ১৭ টাকায়, ১৬ টাকার ফসফেট বা ডিএপি বিক্রি হচ্ছে ২২ টাকায়। কৃষকেরা জানান যে সার কিনতে আগে এক হাজার টাকা লাগত, এখন লাগছে এক হাজার ৫০০ টাকা। বাংলাদেশে সারে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দেয়া হয়। কৃষি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে এখন প্রতি কেজি ইউরিয়া সারের দাম এখন ৮১ টাকা। কেজিতে ছয় টাকা বাড়ানোর পরও এখনো সরকারকে ৫৯ টাকা ভর্তুকি দিতে হবে। কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে যে, বাংলাদেশে সব রকমের সারের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। আমন মৌসুমে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত দেশে ইউরিয়া সারের চাহিদা ছয় লাখ ১৯ হাজার মেট্রিক টন। বর্তমানে ইউরিয়া মজুত আছে সাত লাখ ২৭ হাজার মেট্রিক টন। অন্যান্য সারের মধ্যে টিএসপির আমন মৌসুমে চাহিদা এক লাখ ১৯ হাজার টন। মজুত আছে তিন লাখ ৯ হাজার টন। ডিএপির চাহিদা দুই লাখ ২৫ হাজার টন। মজুত আছে ছয় লাখ ৩৪ হাজার টন। এমওপির চাহিদা এক লাখ ৩৭ হাজার টন। মজুত আছে দুই লাখ ১০ হাজার টন। কৃষি মন্ত্রণালয় বলছে,"কৃষকেরা আসলে না বুঝতে পেরে ইউরিয়া সার বেশি ব্যবহার করছে। ডিএপির মধ্যেই ইউরিয়া সার আছে। দাম বাড়ার কারণে ইউরিয়ার ব্যবহার কমবে। কিন্তু উৎপাদন ব্যাহত হবে না।” উৎপাদন কমবে, আমদানি বাড়বে, কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হবে: ‘‘এবার আউশের উৎপাদন মার খেয়েছে’’ – ড. জাহাঙ্গির আলম খান অবশ্য বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের সাবেক সদস্য কৃষিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন,"এবার আউশের উৎপাদন মার খেয়েছে। বন্যা এবং খরার কারণে আমনের চাষ দেরিতে শুরু হচ্ছে। কিন্তু ইউরিয়া সারের দাম বেড়ে যাওয়ায় আমন চাষ কম হবে। উৎপাদন কম হবে। এর পরে বোরো উৎপাদনও ব্যহত হবে।” তার কথা,"একটি সারের দাম বেড়ে গেলে কৃষক সেটা পোষাতে অন্য সারের ব্যবহারও কমিয়ে দেয়। আর জমিও পতিত থাকে। ফলে উৎপাদন কমতে বাধ্য। আর ইউরিয়ার সঙ্গে অন্য সারের দাম বাড়ারও প্রবণতা শুরু হয়েছে।” তিনি বলেন,"সরকার এবার ১০ লাখ টন চাল আমদানি করেছে। এরপর হয়তো ১৫ লাখ টন আমদানি করবে। দুইটি সার কারখানা বন্ধ গ্যাসের অভাবে বন্ধ হওয়ায় সার আমদানিও আরো বাড়বে। ফলে দুই দিক থেকেই ডলারের ওপর চাপ বাড়বে। তাই সারে ভর্তুকি কমানো ঠিক হয়নি।” তার মতে,"সারের সাথে ডিজেলের দামও বাড়তি। ৭০ ভাগ সেঁচ হয় ডিজলে। শ্রমিকের মজুরি বাড়তি। ফলে কৃষক খুব বিপদে পড়বে।” এদিকে কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক বৃহস্পতিবার সচিলাবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন,"ইউরিয়া সারের দাম বাড়ানোকে কেন্দ্র করে কেউ সংকট বা নৈরাজ্য সৃষ্টি করলে করলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। বিশ্ববাজারে দাম বাড়ায় দাম সমন্বয় করা হয়েছে।” তিনি দাবি করেন,"সারের দাম বাড়ার পরও কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়বে না। ফসলের জমিতে সুষম সার প্রয়োগ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ইউরিয়া সারের বর্তমান ব্যবহার কমপক্ষে ২০ শতাংশ কমালেও একই উৎপাদন পাওয়া যাবে।” এর জবাবে ড. জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন,"কৃষকেরা ইউরিয়া বেশি ব্যবহার করে সত্য। তবে তার দাম বাড়িয়ে তো ব্যবহার কমানোর কৌশল ঠিক না । এর জন্য কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করতে হয়। প্রশিক্ষণ দিতে হয়। আর ইউরিয়ার বিকল্প ডিএপির দাম তো কমানো হয়নি। তাহলে কৃষক সেটা ব্যবহার করবে কেন” বাংলাদেশের কৃষির হালহকিকত জমি নেই ১১.৩৪ ভাগের বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো মোট তিন কোটি ৫৫ লাখ ৩০ হাজার খানার উপর জরিপটি পরিচালনা করেছে ৷ এর মধ্যে কোন ধরনের জমি নেই এমন ভূমিহীনের সংখ্যা ৪০ লাখ ৩০ হাজার খানা৷ শতকরা হিসেবে যা ১১ দশমিক ৩৪ ভাগ৷ বাংলাদেশের কৃষির হালহকিকত ভূমিহীন বেশি শহরে শহরের খানাগুলোর মধ্যে ১৭ লাখ বা ২৮ দশমিক ৭৯ শতাংশেরই কোন জমি নেই৷ অন্যদিকে গ্রামের মোট খানার ৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ ভূমিহীন৷ বাংলাদেশের কৃষির হালহকিকত অধিকাংশ নির্ভরশীল গ্রামে স্বভাবতই দেশে কৃষির উপর নির্ভরশীল বেশিরভাগ মানুষেরই বসবাস গ্রামে৷ জরিপ অনুযায়ী গ্রামে খানার সংখ্যা ২ কোটি ৯৬ লাখ যা ৮৩ দশমিক ৩৭ ভাগ৷ আর বাকি ৫৯ লাখ বা ১৬ দশমিক ৬৩ শতাংশ রয়েছে শহরাঞ্চলে৷ বাংলাদেশের কৃষির হালহকিকত কৃষিভিত্তিক জীবিকা দেশের মোট শ্রমশক্তির ৪০ ভাগই কৃষিতে নিয়োজিত৷ তবে যাদের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি এমন শ্রমভিত্তিক খানা আছে ২৬ শতাংশ৷ বিভাগের দিক থেকে সবচেয়ে বেশি কৃষি শ্রমিক খানা পাওয়া গেছে রংপুরে, ৪২ ভাগ৷ মৎস্যজীবী খানার পরিমান ৯৯ লাখ ৬০ হাজার৷ বাংলাদেশের কৃষির হালহকিকত বেড়েছে গরু দেশে এখন গরুর পরিমান দুই কোটি ৮৪ লাখ ৮৭ হাজার ৪১৫ টি৷ ২০০৮ সালে ছিল দুই কোটি ৫৬ লাখ ৭৮ হাজার ৩০৮ টি৷ ১০ বছরে গরুর সংখ্যা বেড়েছে ২৮ লাখ নয় হাজার ১০৭ টি৷ বাংলাদেশের কৃষির হালহকিকত বেড়েছে ছাগলও বাংলাদেশে বর্তমানে এক কোটি ৯২ লাখ ৫৭ হাজার ৪১৩ টি ছাগল রয়েছে৷ ২০০৮ সালে ছিল প্রায় ১ কোটি ৬৪ লাখ৷ ১০ বছরে ছাগলের সংখ্যা বেড়েছে ২৯ লাখ৷ বাংলাদেশের কৃষির হালহকিকত হাঁস-মুরগি জরিপ চলাকালে বাংলাদেশে ১৮ কোটি ৯২ লাখ ৬২ হাজার ৯০১ টি মুরগি ছিল৷ হাঁস আছে ছয় কোটি ৭৫ লাখ ২৯ হাজার ২১০ টি৷ এর বাইরে ১৪ লাখ ৪৫ হাজার ৪২০ টি টার্কি আছে৷