সাইপ্রাস: দালাল হইতে সাবধান!

title
২ মাস আগে
টানা পাঁচ দিন সাইপ্রাসের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত অভিবাসী ও আশ্রয়প্রার্থীদের সংবাদ সংগ্রহে চষে বেড়িয়েছি৷ নানা শহরে গিয়ে কথা হয়েছে বিভিন্ন পথে সাইপ্রাসে আসা বাংলাদেশি অভিবাসীদের সঙ্গে। আর তখনই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে দেশটি সম্পর্কে বাংলাদেশের মানুষের জানাশোনা কতটা সীমিত৷ যারা ভবিষ্যতে সাইপ্রাস আসার পরিকল্পনা করছেন, তাদের জন্যই কিছু তথ্য জানানোর চেষ্টা করছি। অনেকেই জানেন না যেসাইপ্রাস আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অনুযায়ী একটি রাষ্ট্র হলেও বাস্তবে এর রয়েছে চারটি ভাগ। রাজধানী নিকোসিয়ার ঠিক মাঝ বরাবর একটি সীমান্ত চলে গেছে। এই সীমান্ত কখনও মাঠ, আবার কখনও ঘরবাড়ির মধ্য দিয়ে চলে গেছে৷ এই নিরপেক্ষ এলাকার দেখভাল করে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনী। অন্যদিকে, আরো দুটি ছোট অংশে এখনও রয়েছে ব্রিটিশদের ঘাঁটি৷ সাইপ্রাসে মূলত দুই জাতির সিপ্রিয়টদের বাস- গ্রিক ও তুর্কি। ১৯৭৪ সালে গ্রিক সিপ্রিয়টদের একটি অংশ ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করলে তুরস্ক সৈন্য পাঠিয়ে দ্বীপটির প্রায় ৩০ শতাংশ জায়গা দখল করে নেয়। দখলকৃত অংশকে স্বাধীন রাষ্ট্র ঘোষণা দিয়ে নাম দেয়া হয় টার্কিশ রিপাবলিক অব নর্থ সাইপ্রাস। এই রাষ্ট্রকে অবশ্য তুরস্ক ছাড়া আর কোনো দেশ স্বীকৃতি দেয়নি৷ ফলে সাইপ্রাস যখন ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত হয়, তখন পুরো দ্বীপটিই এর মধ্যে ঢুকলেও দুই পাশের অভিবাসীরা পান ভিন্ন ভিন্ন সুবিধা। তুর্কি সিপ্রিয়টরা সহজেই সীমান্ত পাড়ি দিতে পারলেও, স্টুডেন্ট ভিসা বা ওয়ার্ক পারমিটে আসা বাংলাদেশিরা সহজে ওপারের মূল সাইপ্রাসে আসতে পারেন না৷ তবে সাইপ্রাসের এমন ভাগাভাগির কথা বাংলাদেশে অনেকেই জানেন না। সারাজীবন গ্রামে বা মফস্বলে কাটানো মানুষ তো দূরের কথা, নর্থ সাইপ্রাসে এমন কিছু বাংলাদেশির সঙ্গে পরিচয় হয়েছে, যারা ভালো ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেও জানতেন না যে সাইপ্রাসের উত্তর অংশটি বাস্তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অংশ নয়৷ আর এই সুযোগ নেয় দালালেরা। নর্থ সাইপ্রাসে এমন কিছু বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজ রয়েছে, যারা স্টুডেন্ট মার্কেটিংয়ের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করে। অর্থাৎ, বিভিন্ন দেশ থেকে ছাত্র এনে দেয়ার বিনিময়ে এজেন্টদের কমিশন দেয়৷ ফলে এটি পরিণত হয়েছে বেশ রমরমা ব্যবসায় ৷ অনেক ছাত্রই সহজে ইউরোপে আসার লোভে এই দালালদের খপ্পরে পড়ে। যে ভার্সিটিতে ভর্তি হতে আড়াই লাখ টাকা খরচ হওয়ার কথা, সেটি বাংলাদেশের এজেন্টের কমিশন, সাইপ্রাসের এজেন্টের কমিশন, ঢাকার শাহজালালএবং দুবাইয়ের এয়ারপোর্টে ইমিগ্রেশনে ঘুস সহ শেষ পর্যন্ত গিয়ে দাঁড়ায় ছয়-সাত লাখ টাকায়৷ এই শিক্ষার্থীদের বলা হয়, তারা পড়াশোনার পাশাপাশি চাকরি করে টিউশন ফি উপার্জন করতে পারবেন। তাছাড়া চাইলেই ইউরোপের অন্য নানা বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যেতে পারবেন। কিন্তু বাস্তবে সেটি আর সম্ভব হয় না৷যাদের দেশ থেকে টাকা নিয়ে আসার সামর্থ রয়েছে, তাদের এভাবেই টাকা এনে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হয়৷ যাদের সামর্থ নেই, তারা শেষ পর্যন্ত হয় সমুদ্রপথে তুরস্ক চলে যান, অথবা আরেক দালালের সহায়তায় রাতের অন্ধকারে জাতিসংঘের বাফার জোর পেরিয়ে মূল সাইপ্রাসে চলে যান। একই ঘটনা ঘটে যারা ওয়ার্ক পারমিটে আসেন, তাদেরও। এয়ারপোর্ট কনট্রাক্টের মাধ্যমে তাদের মাসে লাখ টাকা উপার্জনের স্বপ্ন দেখিয়ে আনা হয় নর্থ সাইপ্রাসে। কিন্তু তারপর দেখা যায় ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা কাজ করেও তারা কেবল কোনো রকমে ২০-২৫ হাজার টাকা উপার্জন করতে পারেন৷ পুরনারা ক্যাম্পের সামনে ডয়চে ভেলের সাংবাদিক অনুপম দেব কানুনজ্ঞ তাদের পাসপোর্ট থেকে যায় দালাল অথবা কাজের মালিকের কাছে৷ সেই পাসপোর্ট রেখেই সীমান্ত পাড়ি দিয়ে আসা অনেকের সঙ্গেও কথা হয়েছে আমার। এইভাবে সাইপ্রাসের উত্তর থেকে দক্ষিণে আসার পর কী হয়? বৈধ কাগজ না থাকায় তাদের আশ্রয় আবেদন প্রার্থনা করতে হয়, স্থান হয় শরণার্থী ক্যাম্পে। বাংলাদেশ যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ না হওয়ায় অন্য অনেক দেশের সঙ্গে বাংলাদেশও রয়েছে সাইপ্রাসের নিরাপদ দেশের তালিকায়।ফলে হাতে গোনা দুই একজন ছাড়া বাকিদের শরণার্থী আবেদন প্রত্যাখ্যান হয়ে যায়৷ এরপর শুরু হয় উকিলের কাছে দৌড়। প্রতিবার আশ্রয়আবেদন প্রত্যাখ্যানের পর উকিলকে টাকা দিয়ে আবার নতুন করে আপিল করতে হয়, আবার সেটি প্রত্যাখ্যান হয়, আবার আপিল, আবার প্রত্যাখ্যান। কেউ কেউ এভাবেই কাটিয়ে দিচ্ছেন ১০-১২ বছর৷ বসনিয়া-সার্বিয়া বা গ্রিস ইউরোপের মূল ভূখণ্ডে অবস্থিত হওয়ায় অনিয়মিত অভিবাসীদের অনেকেই এক দেশে আবেদন প্রত্যাখ্যান হলে অন্য দেশে ঝুঁকি নিয়ে হলেও যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু সাইপ্রাস দ্বীপ রাষ্ট্র হওয়ায় এখান থেকে অন্য কোনো দেশে যাওয়ার সুযোগ একেবারে নাই বললেই চলে৷ অনেক অভিবাসীই সাইপ্রাসের বাস্তব পরিস্থিতিআগে জানলে না আসার সিদ্ধান্ত নিতেন বলে জানিয়েছেন। কিন্তু এখন দেশে এত টাকা ধারদেনা হয়েছে যে ফিরে যাওয়ার কথাও তারা ভাবতে পারছেন না। অন্যদিকে আদৌ কোনোদিন তারা এই দেশের নাগরিকত্ব তো দূরের কথা, থাকার স্থায়ী অনুমতি পাবেন কিনা সে বিষয়েও নিশ্চিত নন৷ শেষ উপায় হিসাবে কেউ কেউ বেছে নিচ্ছেন 'কনট্রাক্ট ম্যারেজ' নামের একটি পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোনো একটি দেশের নাগরিককে টাকার বিনিময়ে বিয়ে করে বৈধ বসবাসের কাগজ নেয়ার চেষ্টা করা হয়। এই কাজেও রয়েছে একটি দালাল চক্র। তবে এই আইনকে যে এভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে, সেটি নজরে আসায় এখন সাইপ্রাস সরকার এ বিষয়েও শুরু করেছে কড়াকড়ি। এমনকি কন্ট্রাক্ট নয়, বরং প্রেম করে সিপ্রিয়ট নারীকে বিয়ে করেছেন, সন্তানও হয়েছে, তারপরও কাগজ না পাওয়া এক বাংলাদেশি অভিবাসীর সঙ্গেও কথা হয়েছে আমার৷ এর মধ্যে কি সাইপ্রাসে বাংলাদেশিরা ভালো করছেন না? অবশ্যই করছেন। প্রায় সবকটি শহরেই প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে দেখা হয়েছে, যারা নিজেরা তো জীবনের উন্নতি করেছেনই, তাদের অধীনে কাজ করছেন অনেক বাংলাদেশিও৷ তাদের পরামর্শ কী? ১) সাইপ্রাস দেশটিসম্পর্কে আগে ভালো করে জেনে নিন। এই দেশের এক পাশে মুদ্রা ইউরো, কিন্তু অন্য পাশে তুর্কি লিরা। এক পাশে ভাষা গ্রিক, অন্য পাশে তুর্কি। এমন নানা তথ্য ইন্টারনেটেই পেয়ে যাবেন। ফলে আপনি কীভাবে, কোথায়, কেন আসতে চাইছেন, এবং এলে আপনি কী কী সুবিধা পাবেন, কী অসুবিধা হবে, একটি টাকাও খরচ করার আগে সেগুলো ভালোভাবে জেনেবুঝে নিন৷ ২) দালাল হইতে সাবধান থাকুন৷ যে যা বলবে বিশ্বাস না করে নিজে খোঁজ নিয়ে দেখুন। প্রয়োজনে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের শরণাপন্ন হন৷ ওয়ার্ক পারমিটের নামে আপনাকে যে কাগজ দেয়া হচ্ছে, সেই কাগজ এবং প্রতিষ্ঠান ভুয়া কিনা, তা আগেই যাচাই করে দেখার চেষ্ঠা করুন৷ ৩)পড়াশোনা করতে এলে আপনার বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজটি ভালো মানের কি না সেটি আগে খোঁজ নিন৷ পড়া শেষ হওয়ার আগেই হাজার হাজার ইউরো আয়ের চিন্তা করলে চলবে না। রেজাল্ট ভালো হলে সাইপ্রাসেও ভালো কিছু করা সম্ভব৷