তৃতীয় সুর, ষষ্ঠ সুরে আটকে বাংলার ট্রোল রাজনীতি

title
১০ দিন আগে
পদ্মার এপার-ওপার দুইপারই এখন এক বাবা-ছেলের ইতিহাস নদীর জলে ভাসিয়ে দিয়েছে। সম্প্রতি হিরো আলমের খবর পড়তে পড়তে সেই বাবার কথা প্রথম মনে পড়ছিল। গুপীগাইন বাঘাবাইনের সেই অমোঘ দৃশ্যে (পরবর্তীকালে চলচ্চিত্রে বাঁধবেন তার নাতি) ভাঙা তানপুরা নিয়ে গুপী রাজার ঘুম ভাঙালো। তার আগে অবশ্য গাঁয়ের লোক চণ্ডীমণ্ডপে বসে যথেষ্ট ট্রোল করেছে গুপীবাবুকে। ঠিক যেভাবে হিরো আলম কিংবা রোদ্দুর রায়কে মইয়ে চড়িয়েছি আমরা! তা সেই গুপী এমন গান শোনালো যে, রাজা তৃতীয় সুর আর ষষ্ঠ সুরের দাওয়াই দিলেন দেগে। সরগমের তৃতীয় সুর 'গা' আর ষষ্ঠতে ওষ্ঠে আসে 'ধা'। অগত্যা উল্টো গাধায় চড়ে গ্রাম ছাড়ার শাস্তি হলো। কী ভীষণ মিলে যাচ্ছে না আজকের রাজাদের সঙ্গে? হিরো আলমবাবুকে প্রায় সেই একই কায়দায় মুচলেকা লেখালো ওপারের পেয়াদাবাবুরা। আর রোদ্দুরবাবুকে এপারের দারোগাবাবুরা কার্যত কান ধরে টেনে ঢোকালেন গরাদে। আর অ্যাদ্দিন ধরে এই দুই ভীষ্মলোচন শর্মাকে সমাজ মাধ্যমে যারা ভাইরাল করলেন, 'গুগাবাবা'র মুরুব্বিদের মতোই তারা তামাকে টান মেরে বললেন-- দেখ কেমন লাগে। উপেন্দ্রকিশোর লিখেছিলেন গুপী গাইন বাঘা বাইন (গুগাবাবা)। আর তার ছেলে লিখলেন আবোলতাবোল। মনে পড়ছে ছড়াটা? গান ধরেছে গ্রীষ্মকালে ভীষ্মলোচন শর্মা/আওয়াজখানা দিচ্ছে হানা দিল্লি থেকে বর্মা। ভাগ্যিস সে সময় ইন্টারনেট এবং সমাজমাধ্যম নামক নরকগুলজার ছিল না! থাকলে বর্মার গণ্ডি পার করে দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার বায়ুস্তর পেরিয়ে টোকিও এবং হনুলুলু হয়ে অ্যামেরিকা এবং ইউরোপের বঙ্গসমাজকেও গ্রাস করতেন, বলা ভালো আসক্ত করতেন রোদ্দুর এবং হিরোবাবুরাই। ছন্দ মেলাতে নতুন পঙতি ভাবতে হতো সুকুমার রায়কে। কারণ তিনি জানতেন, তার আবোলতাবোলই বঙ্গসমাজের বাস্তবতা। ভীষ্মলোচনেরা ছড়িয়ে আছেন দিকে দিকে। আর তাদের ভাইরাল করার জন্য ট্রোলবাহিনীও ঘুরে বেড়াচ্ছে ল্যাজে ল্যাজে। সেই ল্যাজে ল্যাজে ঘোরা পাঠকের কাছে বিনীত প্রশ্ন-- বুকে হাত রেখে বলতে পারবেন, সমাজ মাধ্যমে শ্রীরোদ্দুর এবং জনাব হিরোর 'সিলি-পনা' নিয়ে 'খিল্লি' করেননি কখনো? কমেন্ট করেছেন, ফলো করেছেন, ট্রোল করেছেন এবং যারপরনাই ফূর্তি করেছেন ঠ্যাংয়ে ঠ্যাং তুলে। করেননি? স্যমন্তক ঘোষ, ডয়চে ভেলে করতেই পারেন। তাতে কোনো অন্যায় নেই। সমাজের ঠিকুজিতে কেউ লিখে দিয়ে যাননি যে, সর্বদা রামগরুরের ছানা হয়ে ঠোঁটে সেলোটেপ এঁটে ঘুরতে হবে। সুস্থ মানুষকে ট্রোল করে অসুস্থ করা অন্যায়। কিন্তু যারা মনে করেন, ট্রোলড হলে সমাজমাধ্যমে রিচ বাড়ে, যারা মনে করেন, এভাবেই তারা বঙ্গজীবনের 'সেলিব্রিটি অঙ্গ' হয়ে উঠছেন, তাদের মুর্খামিকে হাসির খোরাকে পরিণত করায় আর যা-ই থাক, অন্যায় নেই। অন্যায় হলো, খোরাককে সিরিয়াস জ্ঞান করা। এবং তার ভিতর রাষ্ট্র নামক একটি যন্ত্রকে যুগপৎ বাঁশ এবং নাকের মতো ঢুকিয়ে দেয়া। যে সমাজে এখনো অনাহার স্বাভাবিক, বেকারত্বের একমাত্র খোয়াব পরলোক বা বেহেস্তে সম্মান, ঘুস খুচরো পাপ এবং দুর্নীতি রাজনীতির শর্ত, যে সমাজ সাবালকত্ব প্রমাণে প্রতি তিন মিনিটে একটি রেপ এবং পরিবার বলতে পুরুষতন্ত্র বোঝে, যে সমাজে অটো সিগনাল ভাঙে এবং অ্যাম্বুলেন্স জ্যামে দাঁড়িয়ে থাকে-- বিশ্বাস করুন, সে সমাজের অভিভাবক এবং তাদের মাইনে করা পেয়াদারা রোদ্দুর রায়-হিরো আলমে মজে থাকলে কেবল বিরক্তি হয় না, সন্দেহ হয়। সন্দেহ হয়, নীতিপুলিশির মায়াজালে মুরুব্বিরা ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া সমাজের আসল সত্যগুলো আড়াল করার চেষ্টা করছে। দুইএকটি ইঁদুর মেরে তারা বাঘ শিকারের নাটক করছে ড্রয়িংরুমের জায়েন্ট স্ক্রিনে। আর আমরা, মানে সমাজের ঝন্টু, মন্টু, পিন্টুরা গপগপ করে গিলছি সেই সব ঢপকীর্তন। ঢপকীর্তন বঙ্গসমাজের অঙ্গ। ঢাক-ঢোল-কাসর-ঘণ্টা সহযোগে একদা ঢপকীর্তন মূলস্রোতের বিনোদনে জনপ্রিয় হয়েছিল খুব। লঘু বিনোদন যুগযুগ ধরে মানুষকে আনন্দ দেয়। আগেও দিয়েছে, ভবিষ্যতেও দেবে। সে বিনোদনে সামিল না হওয়ার স্বাধীনতা সকলের আছে। তাকে 'অপসংস্কৃতি' বলে দাগিয়ে দেওয়ার অধিকারও সমাজের হাত থেকে কেউ ছিনিয়ে নিচ্ছে না। কিন্তু অন্যায় বলে গলা টিপে ধরলে বোঝা যায়, শাসক ভারসাম্য হারিয়েছে। পাঠক মনে রাখবেন, ভারসাম্যহীন শাসককে সবক শেখানোর জন্য জনগণকে সেই গুপী গাইন বাঘা বাইনের কাছেই যেতে হয়। ভূতের রাজা তো প্রতীক মাত্র!