বারবার আদালতে আবেদন বাতিল, তবু হাল ছাড়ছেন না এই বাংলাদেশিরা

title
৪ দিন আগে
সাইপ্রাসে আন্তর্জাতিক সুরক্ষা সংক্রান্তএই প্রশাসনিক আদালত শরণার্থীদের নিয়ে কাজ করে৷ এই আদালতে শরণার্থীদের আবেদন যাচাইবাছাই করা হয়৷ কারো ক্ষেত্রে আবেদন গ্রহণ হয়, কারো ক্ষেত্রে হয় না৷ সাড়ে সাত বছর ধরে সাইপ্রাসে রয়েছেন বাংলাদেশের গোপালগঞ্জের জামাল৷ তিনি শিক্ষার্থী ভিসায় এসেছিলেন৷ পরে শরণার্থী স্ট্যাটাস চেয়ে আবেদন জানিয়েছেন আদালতে৷ তিনি বলেন, ‘‘এখানকার পুলিশ খুব সমস্যা করে৷ বলে দেশে পাঠিয়ে দেব৷ তাই ফাইল ঠিক করতে হবে৷ উকিল ঠিক করেছি৷ দুই বছর যাতায়াত করছি আদালতে৷ কোন যুক্তি দেখিয়ে শরণার্থী মর্যাদা জামালের কথায়, ‘‘শরণার্থী স্ট্যাটাস পেতে উকিল লাগে৷ উকিলই সব ঠিক করে৷ নিজে কিছু করা যায় না৷ একবার আপিলের পর বাতিল হলে ছয় মাস, আট মাস, এক বছর পর ফের আপিল করা যায়৷ আমাদের দেশে রাজনৈতিক সমস্যা আছে এ কথা বলেছি৷ কিন্তু ওরা বলে রাজনৈতিক সমস্যা নেই৷ তিন-চার বার আমার আবেদন বাতিল হয়েছে৷’’ করোনার প্রভাব বাংলাদেশের নোয়াখালি থেকে এসেছিলেন মহম্মদ জাকির৷ তিন বছর সাইপ্রাসে রয়েছেন তিনি৷ প্রথমে নর্থ সাইপ্রাসে শিক্ষার্থী ভিসায় এসেছিলেন, কিন্তু সেখানে ছিলেন মাত্র ১০ দিন৷ করোনা শুরু হতেই দালালের মাধ্যমে চলে এসেছেন এই প্রান্তে৷ জাকির বলেন, ‘‘করোনা শুরু হয়ে গিয়েছে৷ কিছু করতে না পেরে এসেছিলাম নিকোসিয়ায়৷ ১৭-১৮ মাস লকডাউন ছিল৷ পুনারা ক্যাম্পে ছিলাম৷ তারপর অ্যাসাইলাম (আশ্রয়-আবেদন) পেতে আবেদন করি৷ এক মাস পর পেপার দেয়া হয়েছিল৷ সেটা নিয়ে নতুন বাসায় উঠি৷ তারপর ওয়েলফেয়ার অফিসে জমা দিলাম৷ সেখানে পকেট মানি দেয়া হতো৷ তবে এখন অস্থায়ী চাকরি করছি৷’’ সাইপ্রাসে আন্তর্জাতিক সুরক্ষা সংক্রান্ত এই প্রশাসনিক আদালতে এক বাংলাদেশী আবেদনকারীর সঙ্গে কথা বলছেন ডয়চে ভেলের সাংবাদিক অনুপম দেব কানুনজ্ঞ৷ ছবি: আরাফাতুল ইসলাম৷ কোন যুক্তিতে শরণার্থী মর্যাদা চেয়েছেন জাকির? তার কথায়, ‘‘ক্যাম্পে একমাস থাকার পর এক বছরের জন্য পেপার ছিল৷এরপর বাতিল হয়ে যায়৷ এক বছর শেষ হয়ে গিয়েছে৷ এবার আর্থিক সমস্যা দেখিয়ে আবেদন করছি৷’’ কেন রাজনৈতিক কারণ নয়? জাকির বলেন, ‘‘অর্থনৈতিক কারণ দেখিয়েছি. যতটা জানি, দুই দেশের সরকার যোগাযোগ করেছে৷ বাংলাদেশ সরকার বলেছে রাজনৈতিক সমস্যা নেই৷ ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে মানবতা আছে৷ বাংলাদেশ আমাদেরকে অগ্রিম পাঠিয়ে দিতে বলছে৷ কিন্তু এই সরকারের তো মানবতা আছে৷ তাই অপেক্ষা করছি৷’’ ‘দেনা শোধ করতে হবে’ বাংলাদেশের চুয়াডাঙা জেলা থেকে আদালতে এসেছিলেন বছর পঞ্চাশের এমডি আজমল হুডা৷ তিনি বলেন, ‘‘তুর্কি সাইপ্রাস থেকে দালালের মাধ্যমে সাইপ্রাসে এসেছি৷ দালাল মাহবুবের কাছে সব রয়ে গিয়েছে৷ টাইসি ভিসায় পাঠিয়েছিল৷ বড় ইট নামানোর কাজ করি রাস্তায়৷ ৪৫ হাজার টাকা বেতন দেবে বলে পাঠিয়েছিল৷ দিয়েছিল ১৮ হাজার টাকা৷ পাসপোর্ট-ভিসা কিছুই করেনি দালাল৷’’ বয়স বলে কাজ নেই তিনি বলেন, পঞ্চাশের উপরে আমার বয়স৷ দুই বছর এখানে থাকলাম৷বয়স্ক দেখে কাজ দেয় না৷ এ পাশে ঝুঁকি নিয়ে এসেছি৷ নোটিফিকেশন নিতে এসেছি৷ আমার কাজ নেই৷ এই কাগজ দেখালে সরকার ২৬১ ইউরো দেয়৷ দেশে দেনাপাওনা আছে৷ টাকা শোধ করে ফেলতে পারলে দেশে যাব৷ অল্পবিস্তর রোজগার হয় কাজ পেলে৷ দেশে কখনো সখনো ১০-১৫ হাজার টাকা পাঠাই৷ দুই-তিন লাখ টাকা দেনা রয়েছে বাংলাদেশে৷ দেনা শোধ হলে দেশে চলে যাব৷’’ আইনজীবীর খরচ? আগে টাকা দিতে না হলেও এখন টাকা দিতে হচ্ছে আইনজীবীকে, দাবি করেছেন আশ্রয়প্রার্থীরা৷ সাইপ্রাসে আন্তর্জাতিক সুরক্ষা সংক্রান্ত এই প্রশাসনিক আদালতের সামনে আবদেনকারীদের ভিড়৷ ছবি:আরাফাতুল ইসলাম আইনজীবীকে ৩৫০ ইউরো অর্থাৎ প্রায় ৩৫ হাজার দিতে হয়েছে আজমুলকে৷ তার কথায়, ‘‘উকিল বলেছে ফাইল ওপেন করে দেবেন৷ অর্থনৈতিক কারণে অ্যাসাইলাম চেয়েছি৷ এদিকে কোনো কাগজ না থাকলে পুলিশ ধরবে৷ কাগজ থাকলে সমস্যা নেই৷ আমার ডায়াবেটিস আছে৷ তবে সরকার বিনামূল্যে তার চিকিৎসা করেছে৷ মেডিকেল কার্ডও দিয়েছে বিনামূল্যে৷’’ বাংলাদেশেরফরিদপুর থেকে শিক্ষার্থী ভিসায় এসেছিলেন রাজু৷ পাঁচ বছর তিনি এখানে রয়েছেন৷ প্রায় আড়াই হাজার ইউরো ফি দিতে হয়েছে কলেজে৷ তাই শরণার্থী মর্যাদার আশায় আবেদন জানাতে এসেছেন তিনি৷ তিনি বলেন, ‘‘কাজের অনুমতি পাব না, জানতাম না৷ এক ভাই সাহায্য করেছিল আসতে৷ তবে আসার পর কাজ করা যাবে না জানতে পেরেছি৷ ছাত্ররা কাজ করতে পারে না৷ ফাইল বন্ধ হয়ে গিয়েছে৷ নিশ্চিতকরণ করতে এসেছি৷ এখানে স্ট্যাম্পের পর তারপর সাদা কাগজে লিখে দেবে৷’’ সাদা কাগজ কেন? আশ্রয়প্রার্থীর কথায়, ‘‘সাইপ্রাসে থাকা পুরোপুরি বাতিল নাকি নিশ্চিতকরণ রয়েছে সেটা লিখে দেবে সাদা কাগজে৷এরপর অ্যাসাইলাম ইন্টারভিউ হবে৷’’ রাজু বলেন, ‘‘সাইপ্রাসে ঝামেলা হয়৷ বাতিল করে করে ৫ বছর, ৬ বছর থেকে যেতে হয় উকিলের মাধ্যমে৷আমি ভাতা নিইনি৷ কারণ কাজ করছি৷ এখানে কাগজ দিতেই চায় না৷ এই সাদা কাগজ নিয়ে যতদিন পারব থাকব৷’’ ইউরোপে বৈধ অভিবাসন: যে তথ্যগুলো জানা দরকার অভিবাসীর সংখ্যা দুই কোটির বেশি অভিবাসী মানুষের বসবাস ইউরোপের ২৭টি দেশে৷ এ অঞ্চলের শ্রমবাজারে নিযুক্ত রয়েছেন ৮৮ লাখ৷ ২০১৯ সালে ইইউ সদস্যভুক্ত দেশগুলোতে প্রথমবার রেসিডেন্স পারমিট বা বসবাসের অনুমতি পাওয়া তৃতীয় দেশের মানুষের সংখ্যা ছিল ৩০ লাখ৷ ইউরোপে বৈধ অভিবাসন: যে তথ্যগুলো জানা দরকার কারা অনুমতি পান ৩৮ ভাগ অভিবাসী রেসিডেন্স পারমিট পেয়েছেন পরিবারের কোনো সদস্য ইউরোপে থাকার কারণে৷ কাজের সূত্রে থাকার অনুমতি পেয়েছেন ১৭ ভাগ৷ আশ্রয়াপ্রার্থী ছিলেন নয় ভাগ৷ শিক্ষাগত কারণে সুযোগ পেয়েছেন চার ভাগ৷ বাকি ৩২ ভাগ অন্যান্য৷ ইউরোপে বৈধ অভিবাসন: যে তথ্যগুলো জানা দরকার অভিবাসীদের দেশ ২০১৯ সালে প্রথমবারের মতো রেসিডেন্স পারমিট পাওয়াদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিলেন ইউক্রেনের নাগরিক৷ প্রথম দশের মধ্যে বাকিরা যথাক্রমে মরক্কো, চীন, ব্রাজিল, সিরিয়া, রাশিয়া, তুরস্ক, যুক্তরাষ্ট্র ও বেলারুশের নাগরিক৷ ইউরোপে বৈধ অভিবাসন: যে তথ্যগুলো জানা দরকার কর্মসংস্থান তৃতীয় কোনো দেশ থেকে ইউরোপে চাকুরি নিয়ে আসা দক্ষ কর্মীরা পান ব্লু কার্ড৷ এটি নির্ভর করে চাকরির চুক্তিপত্র, পেশাগত যোগ্যতা ও বেতনের উপরে৷ ২০১৯ সালে ৩৭ হাজার বিদেশি নাগরিক ব্লু কার্ড পেয়েছেন ইউরোপে৷ এর বাইরে প্রতি বছর এক লাখের বেশি মানুষ মৌসুমি কর্মী হিসেবে বিভিন্ন খাতে কাজের জন্য আসেন৷ বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ও কারখানার কর্মী বা স্বনিয়োজিত কাজেও ইউরোপে বসবাসের সুযোগ পান অনেকে৷ ইউরোপে বৈধ অভিবাসন: যে তথ্যগুলো জানা দরকার পারিবারিক পুনর্মিলন কোনো অভিবাসী ইউরোপে বৈধভাবে বসবাস ও নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণের মাধ্যমে পরিবারের সদস্যদেরও আনতে পারেন৷ স্বামী বা স্ত্রী, অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তান এবং কিছু ক্ষেত্রে অবিবাহিত সঙ্গী, প্রাপ্তবয়স্ক নির্ভরশীল সন্তান, নির্ভরশীল বাবা-মা, দাদা-দাদি কিংবা নানা-নানিও অনুমতি পেয়ে থাকেন৷ নির্দিষ্ট দেশে পৌঁছানোর পর তাদেরকে রেসিডেন্স পারমিট নিতে হয়৷ শিক্ষা, কর্মসংস্থানের সুযোগ কিংবা প্রশিক্ষণও নিতে পারেন তারা৷ ইউরোপে বৈধ অভিবাসন: যে তথ্যগুলো জানা দরকার উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা এজন্য আগ্রহীরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভর্তির অনুমতি, হেলথ ইন্সুরেন্স, অপ্রাপ্তবয়স্ক হলে অভিভাবকের অনুমতি, কিছু ক্ষেত্রে ভাষাগত দক্ষতার প্রমাণসহ প্রয়োজনীয় শর্তগুলো পূরণ করে ইউরোপের কোনো দেশে আসার আবেদন করতে পারেন৷ কিছু দেশে পড়াশোনার টিউশন ফি নেই, আছে বৃত্তির সুযোগও৷ এছাড়াও খরচ মেটানোর জন্য শিক্ষার্থীদের সপ্তাহে ১৫ ঘণ্টা কাজের সুযোগ রয়েছে৷ পড়াশোনা বা গবেষণা শেষে কর্মসংস্থানের জন্য মেলে নয় মাস সময়৷ ইউরোপে বৈধ অভিবাসন: যে তথ্যগুলো জানা দরকার দীর্ঘমেয়াদী রেসিডেন্স ইউরোপের কোনো দেশে টানা পাঁচ বছর অবস্থানের পর নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণ সাপেক্ষে অভিবাসীরা দীর্ঘ মেয়াদে বসবাসের অনুমতি পেতে পারেন৷ এর ফলে কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ, সামাজিক নিরাপত্তা ও সহায়তা এবং পণ্য ও সেবাপ্রাপ্তির মতো কিছু ক্ষেত্রে ইউরোপের নাগরিকদের মতোই অধিকার ভোগ করতে পারবেন৷ তবে এক্ষেত্রে আলাদা অভিবাসন ও আশ্রয় নীতি অনুসরণ করে আয়ারল্যান্ড ও ডেনমার্ক৷ ইউরোপে বৈধ অভিবাসন: যে তথ্যগুলো জানা দরকার আশ্রয়প্রার্থী ২০১৯ সালে প্রায় সাত লাখ মানুষ ইউরোপে আশ্রয়ের আবেদন জানিয়েছেন৷ প্রথমবারের মতো যারা এমন আবেদন করেছেন, তাদের ১২ ভাগই সিরিয়ার নাগরিক৷ আফগানিস্তানের আট দশমিক ছয় ভাগ, ভেনেজুয়েলার সাত দশমিক এক ভাগ, কলম্বিয়ার পাঁচ ভাগ, পাকিস্তানের ছিলেন প্রায় চার ভাগ৷ ঐ বছর দুই দশমিক এক ভাগ বা ‌১৩ হাজার ১৯০টি আবেদন পড়েছিল বাংলাদেশিদের৷ ২০২০ সালে প্রথম দশ মাসে ইউরোপে মোট তিন লাখ ৯০ হাজার মানুষ আশ্রয়ের আবেদন জানিয়েছেন৷ ইউরোপে বৈধ অভিবাসন: যে তথ্যগুলো জানা দরকার অবৈধদের ফেরত ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত এক লাখ ১৪ হাজার ৩০০ জন অবৈধভাবে ইউরোপে প্রবেশ করেছেন৷ এটি তার আগের বছরের একই সময়ে চেয়ে ১০ ভাগ কম৷ যারা এভাবে আসেন, তাদের একটি বড় অংশকে এক পর্যায়ে ফেরত পাঠানো হয়৷ ২০১৯ সালে চার লাখ ৯১ হাজার জনকে ইউরোপ ছাড়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল৷ এক লাখ ৪২ জনকে ফেরত পাঠানো হয়েছিল৷