তাজমহলের সেই বন্ধ কক্ষগুলোর রহস্য কী?

title
১০ দিন আগে
ভারতের হাই কোর্টের বিচারকরা অবশ্য তেমন মনে করছেন না।তাজমহলের ২০টির বেশি বন্ধ কক্ষ খোলার জন্য আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) এক সদস্য। রজনীশ সিং নামের ওই আবেদনকারীর দাবি ছিল, ‘সমাধিসৌধের প্রকৃত ইতিহাস’ জানতে কক্ষগুলো খুলে দেওয়া হোক।আদালতকে তিনি বলেন, কক্ষগুলোতে হিন্দু দেবতা শিবের একটি মন্দির রয়েছে বলে যে দাবি কিছু ইতিহাসবিদ ও ভক্ত করে থাকেন, তিনি তা পরীক্ষা করে দেখতে চান।তবে আদালত তাতে সায় দেয়নি। বৃহস্পতিবার তার আবেদন খারিজ করে দিয়েছে ভারতের হাই কোর্ট।সপ্তদশ শতাব্দীতে ভারতের আগ্রা শহরে নদীর তীরে তাজমহল তৈরি করেছিলেন মুঘল সম্রাট শাহজাহান। তার সম্রাজ্ঞী মমতাজ চতুর্দশ সন্তান জন্ম দেওয়ার সময় মারা গেলে তার স্মৃতির স্মরণে দৃষ্টিনন্দন অনন্য এই স্থাপনা নির্মাণ করেন তিনি।ইট, লাল বেলেপাথর এবং সাদা মার্বেল দিয়ে নির্মিত এ সমাধিসৌধ জটিল জালি কাজের জন্য বিখ্যাত। ভারতের অন্যতম পর্যটন গন্তব্য এটি।বিবিসি লিখেছে, সর্বজন গৃহীত ওই ইতিহাসের ওপর আস্থা নেই রজনীশ সিংয়ের। তার ভাষ্য, “আমাদের সকলের জানা উচিত, ওই সব কক্ষের পেছনে কী রহস্য আছে?”বিজেপির ওই সদস্য যে কক্ষগুলোর দিকে ইংগিত দিয়েছেন, তার মধ্যে অনেকগুলো তালাবন্ধ ঘর সমাধির ভূগর্ভস্থ অংশে অবস্থিত। সমাধিসৌধের সর্বাধিক প্রামাণিক বিবরণে ওই কক্ষগুলোতে কোনো রহস্য থাকার তথ্য পাওয়া যায় না।তাজমহলের তদারক কর্তৃপক্ষের অন্যতম প্রধান, গবেষক এবা কচ তার গবেষণার সময় স্মৃতিস্তম্ভের কক্ষ ও প্যাসেজগুলোর ছবি তুলেছিলেন। ছবি: রয়টার্স ওই কক্ষগুলো একটি তাহখানার অংশ। প্রচণ্ড গরমে ভূগর্ভস্থ চেম্বারের মাধ্যমে ঠাণ্ডা রাখার ব্যবস্থা থাকে তাহখানায়। আর সমাধিসৌধের নদীমুখী অংশের গ্যালারিতে ছিল সারি সারি কক্ষ।এবা কচ ওই অংশে এক সারিতে ১৫টি কক্ষ দেখেছিলেন, যেখানে একটি সরু করিডোর ধরে পৌঁছাতে হয়।ভেতরে রয়েছে সাতটি বড় কক্ষ। কোটর বা ফোঁকর দিয়ে প্রত্যেকটির মধ্যে যোগাযাগ রক্ষা করা হয়েছে।এছাড়া ছয়টি বর্গাকৃতি কক্ষ এবং দুটি অষ্টভুজাকার কক্ষ রয়েছে। বড় কক্ষগুলো থেকে সুদর্শন খিলানগুলোর ভেতর দিয়ে নদীর দিকে দৃষ্টি মেলা যায়।ভিয়েনা ইউনিভার্সিটির এশিয়ান আর্টের অধ্যাপক কচ কক্ষের ভেতরে চুনকামের নিচে আঁকা অলঙ্করণের চিহ্ন দেখতে পেয়েছেন। কক্ষের মাঝখানে গোলাকার বড় নকশার সঙ্গে তারার বৃত্তের মধ্যে সাজানো জালের মত নকশা রয়েছে।কচ বলেন, “কক্ষের ভেতরে নিশ্চয় তখন গা জুড়ানো বাতাস বইত। সম্রাট আর তার সফরসঙ্গীরা যখন সমাধিতে আসতেন, তাদের অবসর কাটানোর একটি জায়গা হয়ে উঠেছিল ওই অংশটি। এখন সেখানে কোনো প্রাকৃতিক আলো নেই।”এ ধরনের ভূগর্ভস্থ গ্যালারি মুঘল স্থাপত্যে পরিচিত। পাকিস্তানের লাহোর শহরের একটি মুঘল কেল্লায়, জলের কাছে তৈরি করা এই ধরনের আবদ্ধ কক্ষের একটি সারি রয়েছে।সম্রাট শাহজাহান প্রায়ই তাজমহলে পৌঁছাতেন যমুনা নদী দিয়ে নৌকায় চড়ে। ঘাটের চওড়া সিঁড়িবেয়ে পৌঁছাতেন উপরে, তারপর প্রবেশ করতেন সমাধিতে। প্রত্নতত্ত্ব সংরক্ষক অমিতা বেগ ২০ বছর আগে প্রথম তাজমহল পরিদর্শন করেন। সেই সময়ের অভিজ্ঞতা স্মরণ করে তিনি বলেন, “সুন্দর নকশা করা করিডোরটির কথা আমার মনে পড়ে। বড় জায়গায় সেই খোলা কোরিডরটি নিশ্চিতভাবে সম্রাটের আসা-যাওয়ার জন্য ছিল।” ছবি: রয়টার্স আগ্রায় বেড়ে উঠলেও ইতিহাসবিদ রানা সাফভি থাকেন দিল্লিতে। তিনি বলেন, ১৯৭৮ সালের বন্যার আগে ভূগর্ভস্থ কক্ষগুলো দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত ছিল।“ওই বন্যায় সমাধিসৌধে জল ঢুকে পড়ে, কিছু ভূগর্ভস্থ কক্ষে পলি পড়েছিল এবং ফাটল ধরেছিল। সে সময় কর্তৃপক্ষ কক্ষগুলো বন্ধ করে দেয়। এসব কক্ষের ভেতরে কিছুই নেই।”তবে সংস্কার কাজের জন্য কক্ষগুলো মাঝেমধ্যে খোলা হয় বলে জানান তিনি।পৌরাণিক কাহিনী ও অ্যাখ্যানবিবিসি লিখেছে, তাজমহল নিয়ে পৌরাণিক কাহিনী এবং লোককাহিনী রয়েছে বিস্তর।এসব গল্পের একটি হল, শাহজাহান বর্তমান তাজমহলের বিপরীতে ‘কালো তাজ’ নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন।এ ছাড়া তাজমহলের স্থপতি নাকি একজন ইউরোপীয়। পশ্চিমা পণ্ডিতদের কারও কারও মতে, মুঘল আমলে মুসলিম সমাজে নারীদের যেভাবে নিচু অবস্থানে দেখা হত, তাতে একজন নারীর জন্য ওই সময় তাজমহল নির্মিত হওয়ার কথা না। তবে মুসলিম বিশ্বে নারীদের জন্য নির্মিত আরও অনেক সমাধিসৌধ রয়েছে। ফলে ওই যুক্তি ধোপে টেকে না।তাজমহল নির্মাণ শেষ হওয়ার পর শাহজাহান নাকি স্থপতি ও শ্রমিকদের মেরে ফেলেছিলেন।স্থানীয় উৎসাহী গাইডরা সেরকম গল্প পর্যটকদের শুনিয়ে থাকেন।ভারতে এমন কথাও প্রচলিত রয়েছে যে, তাজমহলের জায়গায় আগে একটি শিব মন্দির ছিল।১৭৬১ সালে হিন্দু রাজা সুরজ মাল আগ্রা জয় করার পর দরবারের এক পুরোহিত তাজকে একটি মন্দিরে রূপান্তর করার পরামর্শ দিয়েছিলেন বলে জানা যায়।পিএন ওক ১৯৬৪ সালে ভারতীয় ইতিহাস পুনর্লিখনের জন্য একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন। একটি বইয়ে তিনি বলেছিলেন, তাজমহল প্রকৃতপক্ষে একটি শিব মন্দির। ছবি: রয়টার্স ২০১৭ সালে সংগীত সোম নামে এক বিজেপি নেতা তাজমহলকে ভারতীয় সংস্কৃতির একটি ‘কলঙ্ক’ আখ্যায়িত করেন। তার ভাষায়, ওই মহল নির্মিত হয়েছিল ‘বিশ্বাসঘাতকদের’ হাত দিয়ে।দিয়া কুমারী নামে বিজেপির এক এমপি এ সপ্তাহেই দাবি করেন, শাহজাহান একটি হিন্দু রাজপরিবারের মালিকানাধীন জমি ‘দখল করে’ স্মৃতিস্তম্ভটি নির্মাণ করেছিলেন।ইতিহাসবিদ রানা সাফভি বলেন, এই তত্ত্বগুলো গত এক দশকে ডানপন্থিদের একটি অংশে নতুন করে ডালপালা মেলতে শুরু করেছে।“ডানপন্থি একটি অংশ ভুয়া খবর, মিথ্যা ইতিহাস এবং হিন্দুদের ক্ষতি বা ভুক্তভোগী হওয়ার তথ্য ছড়াচ্ছে।”আর গবেষক কচ তার গবেষণায় বলেছেন, “মনে হয়, তাজমহল সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার চেয়ে লোককথাই বেশি প্রচলিত রয়েছে।”