করোনাভাইরাসের নতুন ধরন ফাঁকি দিচ্ছে টিকার প্রতিরক্ষা: গবেষণা

title
৪ দিন আগে
বুধবার সিএনএন জানায়, হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের বেথ ইসরায়েল ডেকোনেস মেডিকেল সেন্টারের গবেষকদের বিশ্লেষণ করা নতুন তথ্যউপাত্ত থেকে এমনটি জানা গেছে।অবশ্য কোভিড-১৯ এর টিকা এখনও গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়া ঠেকাতে উল্লেখযোগ্য প্রতিরক্ষা দেবে বলেই আশা করা হচ্ছে। টিকা উৎপাদকেরা ভাইরাসের এই ধরনগুলোর বিরুদ্ধে আরও শক্তিশালী প্রতিরক্ষা দিতে সক্ষম টিকার ডোজ উদ্ভাবনে কাজ করে যাচ্ছেন।বুধবার নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিনে প্রকাশিত নতুন ওই গবেষণাপত্রে জানানো হয়েছে, আগে সংক্রমিত হওয়া থেকে অথবা টিকাগ্রহণের মাধ্যমে দেহে যে অ্যান্টিবডির সৃষ্টি হয় তার সক্রিয়তা করোনাভাইরাসের মূল ধরনের তুলনায় অমিক্রনের সাবভ্যারিয়েন্ট বা উপধরন বিএ.৪ ও বিএ.৫ ধরনের বিরুদ্ধে কয়েকগুণ কম।  বোস্টনের বেথ ইসরায়েল ডেকোনেস মেডিকেল সেন্টারের সেন্টার ফর ভাইরোলজি অ্যান্ড ভ্যাকসিন রিসার্চের পরিচালক এবং ওই গবেষণাপত্রের একজন লেখক ড. ড্যান বারোচ বলেন, “গবেষণায় আমরা দেখেছি, করোনাভাইরাসের পুরানো ধরন বিএ.১ ও বিএ.২ এর তুলনায় বিএ.৪ ও বিএ.৫ এর বিরুদ্ধে ভাইরাসটি দমনে সক্ষম অ্যান্টিবডির সক্রিয়তা তিন গুণ কমে যায়।”সিএনএনকে লেখা একটি ইমেইলে তিনি বলেন, “কোভিড-১৯ এর মূল ধরনের তুলনায় বিএ.১ ও বিএ.২ এর বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডির সক্রিয়তা এমনিতেই কম।”ড. বারোচ জানান, “আমাদের তথ্যউপাত্ত বলছে অমিক্রনের এই নতুন উপধরনগুলো জনগোষ্ঠীর মধ্যে নতুন করে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বাড়িয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে টিকা নেওয়ায় যাদের মধ্যে ভালো সুরক্ষা গড়ে উঠেছে এবং যারা স্বাভাবিকভাবে বিএ.১ ও বিএ.২ এর বিরুদ্ধে সুরক্ষা অর্জন করেছেন তারাও সংক্রমিত হতে পারেন।“যদিও এখনও এটা ধরে নেওয়া যায় যে টিকা গ্রহণের মাধ্যমে অর্জিত প্রতিরক্ষা বিএ.৪ ও বিএ.৫ এর সংক্রমণে গুরুতর অসুস্থ হওয়া থেকে এখনও উল্লেখযোগ্য পরিমোণে সুরক্ষা দেবে।”নতুন প্রকাশিত এই গবেষণার ফলের সঙ্গে কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির আলাদা আরেকটি গবেষণার ফলের মিল পাওয়া গেছে।কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির গবেষকেরাও সম্প্রতি দেখতে পেয়েছেন যে অমিক্রনের অন্য উপধরনগুলোর তুলনায় বিএ.৪ ও বিএ.৫ ধরন দুটি সম্ভবত বুস্টার ডোজ নেওয়া প্রাপ্তবয়স্কদের রক্তের অ্যান্টিবডিকে বেশি পরিমাণে ফাঁকি দিতে পারছে, যা কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।ওই গবেষণাপত্রের লেখকেরা জানিয়েছেন যে তাদের গবেষণার ফল বলছে একবার আক্রান্ত আবার করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে, এমনকি যাদের দেহে এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে সুরক্ষা তৈরি হয়েছে তাদেরও। ইউএস সেন্টারস ফর ডিজিজ কনট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের (সিডিসি) হিসাবে, যুক্তরাষ্ট্রে ১৬ বছর বা তার বেশি বয়সের ৯৪ দশমিক ৭ শতাংশ জনগোষ্ঠীর দেহে কোভিড-১৯ রোগ সৃষ্টিকারী করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে টিকা গ্রহণ করার বা আক্রান্ত হওয়ার মাধ্যমে অথবা দুটি উপায়েই।সিডিসির মঙ্গলবারের তথ্যানুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রে গত সপ্তাহে নতুন কোভিড-১৯ রোগীদের প্রায় ৩৫ শতাংশই বিএ.৪ ও বিএ.৫ এর সংক্রমণের শিকার। আগের সপ্তাহে এই হার ছিলো ২৯ শতাংশ।ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর ডিজিজ প্রিভেনশন অ্যান্ড কন্ট্রোল জানায়, এখন পর্যন্ত সনাক্ত হওয়া ধরনগুলোর মধ্যে বিএ.৪ ও বিএ.৫ ধরন দুটি সবচেয়ে দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ছে এবং ধারণা করা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এই ধরনটিই সবচেয়ে সক্রিয় ধরন হিসেবে জায়গা করে নেবে।আরও রূপান্তর! ফাইল ছবি: রয়টার্স নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিনে প্রকাশিত গবেষণাপত্রে জানানো হয়, গবেষকেরা পর্যবেক্ষণ করেছেন যে এই গবেষণায় ফাইজার/বায়োএনটেক এর বুস্টার ডোজ নেওয়া ২৭জন অংশগ্রহণকারীর দেহে দুই সপ্তাহ পরে করোনাভাইরাসের মূল ধরনটির তুলনায় ওমিক্রনের উপধরনগুলোর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থা অনেক কম সক্রিয় ছিল।ওমিক্রনে বিভিন্ন ধরনের মধ্যে তুলনা টেনে গবেষকেরা জানিয়েছেন, ভাইরাস নিষ্ক্রিয় করায় অ্যান্টিবডির সক্রিয়তা বিএ.১ এর বিরুদ্ধে ৬ দশমিক ৪ ভাগ, বিএ.২ এর বিরুদ্ধে ৭ ভাগ, বিএ.২.১২.১ এর বিরুদ্ধে ১৪ দশমিক ১ ভাগ এবং বিএ.৪ ও বিএ.৫ এর বিরুদ্ধে ২১ ভাগ কমে যায়।গবেষণায় অংশগ্রহণকারী ২৭ জনের মধ্যে একই ধরনের ফলাফল দেখতে পেয়েছেন গবেষকেরা। এই অংশগ্রহণকারীরা গড়ে ফলাফল হিসাবের ২৯ দিন আগে বিএ.১ ও বিএ.২ ধরনে আক্রান্ত হয়েছিলেন।গবেষকেরা আরও পর্যবেক্ষণ করেছেন যে যারা আগে আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং টিকাও নিয়েছেন, এমন ব্যক্তিদের দেহে এসব ভাইরাসের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডির সক্রিয়তা তুলনামূলক কিছুটা বেশি।তারা অবশ্য এটাও বলেছেন যে ঠিক কী কারণে ভাইরাসকে নিষ্ক্রিয় করতে অ্যান্টিবডির সক্রিয়তা কমে যাচ্ছে, তা বোঝার জন্য আরও গবেষণা দরকার এবং আরও বেশি অংশগ্রহণকারীর মধ্যে এই গবেষণা পরিচালনা করা যেতে পারে।সিএনএনকে পাঠানো ইমেইলে ড. বারোচ বলছেন, “আমাদের তথ্যউপাত্ত বলছে যে করোনাভাইরাসের আরও রূপান্তরের সামর্থ্য রয়েছে, যার ফলে ভাইরাসটির সংক্রমিত করার ও অ্যান্টিবডিকে ফাঁকি দেওয়ার সামর্থ্য বেড়ে যাবে।“মহামারীর বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ায় এখন এটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে যে আমাদের আরও সতর্ক থাকতে হবে এবং নতুন ধরন ও উপধরন সনাক্ত হওয়ার সাথে সাথেই তা নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যেতে হবে।”গত সপ্তাহে বিজ্ঞান সাময়িকী নেচার-এ প্রকাশিত আরেকটি গবেষণা প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, যে বিএ.১ ধরনে আক্রান্তদের দেহে তৈরি হওয়া সুরক্ষা ব্যবস্থাকে এড়িয়ে যাওয়ার সক্ষমতা নিয়ে অভিযোজিত হতে পারে ওমিক্রন, যা থেকে ধারণা পাওয়া যাচ্ছে যে বিএ.১ এর ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা টিকার বুস্টার ডোজ হয়ত বিস্তৃত জনগোষ্ঠীকে ওমিক্রনের বিএ.৪ ও বিএ.৫ এর মতো উপধরনগুলো থেকে সুরক্ষা দিতে পারবে না।যুক্তরাষ্ট্রের হিউস্টন মেথডিস্ট হসপিটালের একজন এক্সপেরিমেন্টাল প্যাথলজিস্ট ড. ওয়েসলি লং বলেন, “এই সবকিছুর অর্থ দাঁড়াচ্ছে, জনসাধারণকে সতর্ক থাকতে হবে যে তারা আবারও অসুস্থ হতে পারেন, এমনকী যদি তারা আগেও কোভিড-১৯ এর আক্রান্ত হয়ে থাকেন।“ওইসব মানুষকে নিয়ে আমি খানিকটা উদ্বিগ্ন যারা আগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। বিএ.৪ ও বিএ.৫ এর বিরুদ্ধে সুরক্ষিত- এমন একটি ভ্রান্ত ধারণা নিয়ে তারা আছেন। কারণ আমি গত কয়েক মাসে আবারও কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হওয়া কিছু রোগী পেয়েছি যারা বিএ.২ ধরনে সংক্রমিত হয়েছেন।”টিকা উৎপাদনকারী কিছু প্রতিষ্ঠান ভ্যারিয়েন্ট-ভিত্তিক টিকা উদ্ভাবনে কাজ করছে যাতে করোনাভাইরাসের উদ্বেগ সৃষ্টিকারী ধরন এবং উপধরনগুলোর বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডির সক্রিয়তা আরও ভালো হয়।টিকা হালনাগাদ করার কাজ চলছে ফাইল ছবি বুধবার মডার্না জানিয়েছে, তাদের কোভিড-১৯ টিকার এমআরএনএ-১২৭৩.২১৪ নামের বুস্টার ডোজ ওমিক্রনের বিএ.৪ ও বিএ.৫ উপধরনের বিরুদ্ধে ‘শক্তিশালী’ সুরক্ষা প্রদর্শন করেছে।অনুমোদনের পথে থাকা এই বুস্টার ডোজ মডার্নার মূল কোভিড-১৯ টিকা ও ওমিক্রন ধরনটি ঠেকাতে তৈরি করা টিকার সমন্বয়ে তৈরি। কোম্পানির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে তারা আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এই টিকার অনুমোদনের প্রক্রিয়া শেষ করতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার দ্বারস্থ হচ্ছে।বুধবারের ঘোষণায় মডার্নার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা স্টেফান ব্যানসেল বলেন, “সার্স-কভ-২ এর ধারাবাহিক রূপান্তরের মুখে আমরা খুবই উৎসাহবোধ করছি এটা জানাতে যে এমআরএনএ-১২৭৩.২১৪ - যা এই শরতে আমাদের প্রধান বুস্টার ডোজ বিএ.৪ ও বিএ.৫ ধরনের বিরুদ্ধে খুবই সক্রিয়তা দেখিয়েছে।”তিনি বলেন, “আমরা জরুরি ভিত্তিতে নিয়ন্ত্রকদের কাছে এসব তথ্যউপাত্ত জমা দেব এবং আগস্টের শুরুতেই সরবরাহ করার জন্য আমরা আমাদের নতুন প্রজন্মের বুস্টার ডোজ উৎপাদনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। যাতে শরতের শুরুতে সার্স-কোভ-২ সংক্রমণ বাড়ার যে সম্ভাবনা তার আগেই বুস্টারটি বাজারে আনা সম্ভব হয়।”আসছে শরতে বুস্টার ডোজ হিসেবে ব্যবহার করার জন্য কোভিড-১৯ টিকার কোন সমন্বয়টি ব্যবহার করা হবে তা নিয়ে আলোচনার জন্য আগামী সপ্তাহে সভা করবে ইউএস ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের টিকা ও সংশ্লিষ্ট জৈব পণ্য বিষক উপদেষ্টা কমিটি।মডার্না জানিয়েছে তাদের নতুন বুস্টার ডোজটি অমিক্রনের বিএ.৪ ও বিএ.৫ ধরনের বিরুদ্ধে তাদের মূল টিকার তুলনায় কয়েকগুণ বেশি কার্যকর।