আফগানিস্তানে ভূমিকম্প: ৫ শয্যার ক্লিনিকে চিকিৎসা চাই ৫০০ জনের

title
৪ দিন আগে
গত মঙ্গলবার রাতে ভয়াবহ এক ভূমিকম্পে ধ্বংস্তুপে পরিণত হয়েছে আফগানিস্তানের পূর্বাঞ্চল। সরকারি হিসাবে বুধবার পর্যন্ত যেখানে এক হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যুর খবর দেওয়া হয়। এখনও উদ্ধার কাজ চলছে।তালেবান প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলেছেন, ভূমিকম্পে হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়বে। তবে বৃহস্পতিবার নিহতের সংখ্যা কততে গিয়ে ঠেকেছে তার সঠিক হিসাব বিবিসি-র হাতে নেই।গত দুই দশকের মধ্যে ভূমিকম্পে আফগানিস্তানে এত মানুষের মৃত্যু হয়নি।গায়ানের যে ক্লিনিকের কথা বলা হচ্ছে, তার একজন কর্মী মুহাম্মদ গুল বিবিসি-কে বলেন, ‘‘বুধবার সকাল থেকে প্রায় ৫০০ রোগীকে এখানে আনা হয়েছে। তাদের ২০০ জন মারা গেছেন। অস্থায়ী এই ক্লিনিকের সবগুলো কক্ষই ভূমিকম্পে ধ্বংস হয়েছে।”মঙ্গলবারের ভূমিকম্পে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে পাকতিকা প্রদেশে। সেখানকার প্রত্যন্ত গায়ান জেলা থেকে হাতেগোণা কয়েকজন রোগীকে হেলিকপ্টারে করে বিভিন্ন নগরীর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।কিন্তু যাদের যাওয়ার কোনো জায়গা নেই তারা অস্থায়ী ওই ক্লিনিকে পড়ে আছেন। মাত্র দুইজন চিকিৎসক তাদের চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করছেন বলেও জানান গুল।তিনি বলেন, যে জেনারেটর দিয়ে সেখানে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে জ্বালানির অভাবে সেটাও বেশিক্ষণ চালানো যায় না। অন্যান্য প্রদেশ থেকে সাহায্যের যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে সেগুলো এখনও পৌঁছায়নি। যদিও এখনও আহতদের ক্লিনিকে আনা হচ্ছে।‘‘কয়েক ডজন মানুষের জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন। আমার মনে হয় না তারা রাত পার করতে পারবে।”ভূমিকম্পে পাহাড়ি গায়ান জেলার পুরোটাই ধ্বংস হয়ে গেছে। এখনও অনেক মানুষ ধ্বংসস্তুপের নিচে চাপা পড়ে আছে বলে ‍ধারণা করা হচ্ছে।আন্তর্জাতিক বিভিন্ন দাতব্য সংস্থার কয়েকটি অস্থায়ী হাসপাতাল সেখানে ছোটখাট রোগের চিকিৎসা হয়। গুরুতর অসুস্থ রোগীদের, দুর্ঘটনায় পড়া বা জরুরি চিকিৎসার কোনো ব্যবস্থা সেগুলোতে নেই। ছবি বিবিসি তার উপর গত বছর অগাস্টে তালেবান দেশটির ক্ষমতা দখলের পর অনেক আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থা দেশটি ত্যাগ করে চলে যায়। আন্তর্জাতিক নানা ত্রাণ তহবিল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামেরও ভয়াবহ ঘাটতি রয়েছে।মঙ্গলবার গায়ান জেলার তালেবানের ভারপ্রাপ্ত গভর্নর ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনে গেলে দুর্গতরা চিৎকার করে তাকে সেখানে থেকে চলে যেতে বলেন বলে বিবিসি-কে জানিয়েছেন পাশের জেলা থেকে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করতে যাওয়া এক ব্যক্তি।নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, ‘‘এই দুর্যোগ মোকাবেলা করার সক্ষমতা তালেবানের নেই। সেখানে কোনও ব্যবস্থাপনা নেই। আমরা আন্তর্জাতিক সাহায্যের আশাও করতে পারছি না। বিশ্ব আফগানিস্তানকে ভুলে গেছে।”তালেবানের ক্ষমতা দখলের আগেও আফগানিস্তানের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা খুবই নাজুক ছিল। যেখানে প্রাকৃতিক কোনো দুর্যোগে জরুরি সাহায্য ব্যবস্থা খুবই সীমিত ছিল।পাকতিকা প্রদেশের চিকিৎসা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, এমনকী তাদের কাছে ব্যাথানাশক ওষুধ ও অ্যান্টিবায়োটিকেরও ভয়াবহ সংকট রয়েছে।পাশের জেলা থেকে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে গায়ান ক্লিনিকে কাজ করতে আসা একজন চিকিৎসক বিবিসি-কে বলেন, ক্লিনিকে তরুণ এক পিতা তার সন্তান এবং বাকি পরিবার কোথায় জানতে চেয়ে হাউমাউ করে কাঁদছেন। ওই ব্যক্তির বুকের হাড় ভেঙে গেছে।‘‘তিনি বার বার আমাকে বলছেন, যদি তার পরিবারের কেউ বেঁচে না থাকে তবে যেন তাকেও মরে যেতে দেওয়া হয়।”ক্লিনিকে আসা রোগীদের বেশিরভাগই পুরুষ। নারী ও শিশুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কম। এর কারণ ব্যাখ্যায় ওই চিকিৎসক বলেন, খুব সম্ভবত নারী ও শিশুরা নিজেদের ধ্বংসস্তুপ থেকে টেনে তুলে বেরিয়ে আসতে পারেননি। তারা সেখানেই চাপা পড়ে আছেন।ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়া কয়েকটি শিশুর সঙ্গে কেউ নেই। তাদের কেউ কেউ গুরুতর আহত। কেউ কেউ কাঁদতে কাঁদতে বাবা-মা ও অন্যান্য ভাই-বোনদের বাঁচাতে বলছে।দুর্গতদের কিছু ছবি হাতে পেয়েছে বিবিসি। সেখানে দগদগে ক্ষত নিয়ে লোকজন চিকিৎসা পাওয়ার আশায় ক্লিনিকে অপেক্ষা করছেন। মৃতদেহ মেঝেতে পড়ে আছে।তালেবান প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনও কর্মী সেখানে নেই। যারা কাজ করছেন ‍তাদের বেশিরভাগই প্রতিবেশী জেলা থেকে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে যাওয়া।কাছের শহর উরগুন থেকে আসা এক স্বেচ্ছাসেবক বলেন, বুধবার সকালে তিনি নিজে ৪০টি মৃতেদহ ধ্বংসস্তুপের নিচ থেকে বের করেছেন; যাদের বেশিরভাগই শিশু। আর যাদের জীবিত বের করা যাচ্ছে তাদের অবস্থা আরো ভয়াবহ বলে জানান তিনি।তার কথায়, ‘‘ক্ষত পরিষ্কার করার জন্য এমনকী আমাদের কাছে জীবাণুমুক্ত পানি পর্যন্ত নেই। তার উপর ভয়াবহ গরম। আমার মনে হয় দ্রুত সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়বে।”