গবেষণা করতাম, ‘দলবাজি’ও করতাম: সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

title
এক দিন আগে
খ্যাতনামা এই শিক্ষক-শিক্ষাবিদের ৮৭তম জন্মবার্ষিকীতে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে ‘আত্মজৈবনিক বক্তৃতা’ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার সময়টি স্মরণ করে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, “কেউ কেউ বলতেন, আমরা গবেষণা বাদ দিয়ে দলবাজি করি। একবার কার্জন হলে গিয়েছি, সেখানে একজন শিক্ষক বললেন- ‘আমরা তো ভাই গবেষণা করি’। ভাবটা এমন যে, আমরা শুধু দলাদলি করি, উনারা গবেষণা করেন। “আমাদের সঙ্গে ছিল লেকচারার শরিফুল্লাহ ভূঁইয়া, তিনি তখন বললেন, ‘আহমেদ শরীফের যে গবেষণা কাগজ আছে, সেগুলো কলাভবন থেকে যদি বিছিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে কার্জন হলের  শেষ পর্যন্ত পৌঁছে যাবে।“আমরা কিন্তু গবেষণাও করতাম, দলবাজিও করতাম। দলবাজি করতাম এজন্য যে আমরা স্বায়ত্তশাসন চাই, আমরা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চাই।”সাম্যবাদী আদর্শের চিন্তাবিদ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, “আমাকে সব নির্বাচনে দাঁড়াতে হত। আপনারা ভাবতে পারবেন না আইয়ুব খানের সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন কীরকম ছিল! তার বিরুদ্ধে ছাত্ররা ১১ দফা দিয়েছে, আওয়ামী লীগ তার বিরুদ্ধে বলেছে। বাংলাদেশ স্বাধীন না হলে ওই আইন বাতিল হত না। স্বাধীনতার পরেও ওই আইন বাতিল হচ্ছিল না। আমরা আন্দোলন করে আইন এনেছি। গণতান্ত্রিক বিধি চালু হয়েছে।“স্বাধীনতার পরে আমরা যখন দেখলাম, যাদেরকে আমরা প্রতিক্রিয়াশীল বলতাম, তারা তো শেষ হয়ে গেছে। যারা আমরা প্রগতিশীল ছিলাম, তারা দুভাগ হয়ে গেছি। এক দল চলে গেছে প্রশাসনের পক্ষে। আমাদেরকে দাঁড়াতে হয়েছে গণতন্ত্রের পক্ষে। আমরা স্বায়ত্ত্বশাসনকে কার্যকর করতে চেয়েছি। আমরা একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে উদাহরণ সৃষ্টি করতে চেয়েছি, কেমন করে বিশ্ববিদ্যালয়ে গণতন্ত্রের অনুশীলন চলে। সে কারণে আমাদের আলাদা দল করতে হয়েছে।”স্বাধীনতার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট, সিন্ডিকেট, ডিনস কমিটি, শিক্ষক সমিতিসহ বিভিন্ন নির্বাচনে প্যানেল দেওয়াকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ সমর্থক শিক্ষকরা নীল দলে এবং বাম সমর্থক শিক্ষকরা গোলাপি দলে বিভক্ত হয়ে পড়েন। সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনামলে ১৯৮৬ সালে গোলাপি দলের অধ্যাপক আবদুল মান্নান উপাচার্য হওয়ার পর সেই দলে ভাঙন দেখা দেয়।সেই ইতিহাস ‍তুলে ধরে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, “আমরা গোলাপি দল, গোলাপি কাগজে আমাদের নির্বাচনী ইশতেহার দিতাম। আমাদের প্রতিপক্ষ নীল দল, তারা নীল কাগজে ইশতেহার দিত। তারপর দেখা গেল আমাদের গোলাপি দল থেকে একজন প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর হয়ে গেছেন এবং তিনি ভাইস চ্যান্সেলর হবেন, তখন আমাদের দলের অনেকে প্রো-ভাইস চ্যান্সেলরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাচ্ছেন। তখন আমাদের সাদা দল করতে হল। “সাদা দল অর্থ হচ্ছে এর কোনো রং থাকবে না। এখানে আমাদের বন্ধু পদার্থের অধ্যাপক হারুনুর রশীদকে আনলাম, মমতাজুর রহমান তরফদারকে আনলাম। কিন্তু ১৯৯১ সালে যখন খালেদা জিয়া ক্ষমতায় আসছে, সাদা দলের কয়েকজন গিয়ে খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করেছে। আমি সাদা দলের আহ্বায়ক ছিলাম, কিন্তু আমাকে তা জানানো হল না। সাদা দল থেকে তখনই আমার সম্পর্ক শেষ।”১৯৯১ সালের পর থেকে ‘সাদা দল’ বিএনপি-জামায়াত সমর্থক শিক্ষকদের দল হিসেবে পরিচিত হয়ে আসছে। অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটে চারবার উপাচার্য নির্বাচনে প্রতিদ্বদ্বিতা করে তিনবার উপাচার্য প্যানেলে নির্বাচিত হন। তিনি বলেন, “প্রথমবার আমি পারলাম না, বাকি তিনবার আমি সিনেটে নির্বাচিত হয়েছি। দ্বিতীয় বার আমি সর্বোচ্চ ভোট পেয়েছিলাম, রটে গিয়েছিল আমিই ভাইস চ্যান্সেলর হব। এরশাদ যখন ক্ষমতায় আসছেন, তখন ধারণা করা হচ্ছে, তিনি আওয়ামী লীগবিরোধীকে নেবেন। কিন্তু আমি এরশাদ সাহেবকে সরাসরি না করে দিলাম।“এরপর দুবার আমি যে নির্বাচিত হয়েছি, সেটা ছিল ডামি ক্যান্ডিডেট, আমি হব না। কিন্তু তিনজন লাগে। একবার হলেন মনিরুজ্জামান মিঞা, সেইবারও আমি প্যানেলে নির্বাচিত হলাম, আবার হলেন এমাজউদ্দিন আহমদ, সেবারও আমি প্যানেলে নির্বাচিত হলাম।” তিনি বলেন, “অনেকে বলে আমি খুব ভীতু, ভয় পেয়ে গেছি। আবার কেউ কেউ বলেছেন, এমন কোনো দরজা নেই, যেখানে গিয়ে ধাক্কা দিইনি ক্ষমতার জন্য। আবার কেউ কেউ বলেছেন এরা গবেষণা করে না, দলবাজি করে বেড়ায়।”তবে আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে কখনও প্রশাসনিক কাজে আগ্রহ ছিল না বলে জানান অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম। সে কারণে বাংলা একাডেমির মহপরিচালক ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশিনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান হওয়ার প্রস্তাবও ফিরিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। তিনি বলেন, “ইয়াজউদ্দীন সাহেব আমাদের শিক্ষক সমিতির সভাপতি ছিলেন, তিনি এডভাইজার হয়ে সংস্কৃতি মন্ত্রালয়ের দায়িত্ব পেলেন। তিনি আমাকে বললেন আমার বড় শখ আপনাকে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হতে হবে। আমি বললাম আমি তো হব না। এটা আমার কাজ না। মন্ত্রণালয় থেকে ঠিক করা হয়েছিল, আমাক ইউজিসির চেয়ারম্যান করা হবে। ওটাতেও আমি রাজি হইনি।”অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম ১৯৩৬ সালের ২৩ জুন মুন্সিগঞ্জ (বিক্রমপুর ) জেলার শ্রীনগর উপজেলার বাড়ৈখালী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পড়াশোনা করেছেন ঢাকার সেন্ট গ্রেগরিজ স্কুল, নটরডেম কলেজ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে । ইংরেজি সাহিত্যে উচ্চতর গবেষণা করেছেন যুক্তরাজ্যের লিডস এবং লেস্টার ইউনিভার্সিটিতে। পড়াশোনা শেষে দেশে ফিরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন ১৯৫৭ সালে।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার সময় তিনি মাসিক পরিক্রমা (১৯৬০-৬২), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পত্রিকা (১৯৭২), ত্রৈমাসিক সাহিত্যপত্র (১৯৮৪) ইত্যাদি সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা করেন। এই বয়সেও তিনি ‘নতুন দিগন্ত’ নামে সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনার কাজ করেছেন।সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, “আমার বাবা আমাকে আমলা বানাতে চেয়েছিলেন, আমি চেয়েছি আমি শিক্ষকতাই করব। আমি অনেক পত্রিকা সম্পাদনা করেছি। গত ২০ বছর ধরে নতুন দিগন্ত পত্রিকা সম্পাদনা করছি। আমি সম্পাদনা করি, আমি মনে করি সমস্ত কিছু সংঘবদ্ধভাবে করতে হবে। পত্রিকার বের করতে হেব, এক সাথে লিখতে হবে, একলা একলা করলে হবে না।“আমার কাজগুলো ছিল সাংস্কৃতিক। পরিবেশ রক্ষার আন্দোলনে আমি ছিলাম, ওসমানী উদ্যান রক্ষা, লালনের আখড়া রক্ষার আন্দোলনে আমি ছিলাম, রাজনৈতিক কারণে তা রক্ষা করতে পারিনি। আড়িয়াল বিল রক্ষার আন্দোলনে ছিলাম। এই যে তিনটি আন্দোলনে যুক্ত হলাম, এটা কিন্তু পরিবেশবাদী হিসেবে নয়। আমি যুক্ত হয়েছি অধিকারকর্মী হিসেবে।”ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টসের (ইউল্যাব) ইংরেজি সাহিত্যের শিক্ষক ড. আজফার হোসেনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী নির্বাচিত সাক্ষাৎকার 'আজ ও আগামীকাল' বইয়ের মোড়কও উন্মোচিত হয়। অনুষ্ঠানের শুরুতে সংগীত পরিবেশন করে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, চারণ সাংস্কৃতি কেন্দ্র, বিবর্তন সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। এরপর সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বিভিন্ন ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে অধ্যাপকজ সিরাজুল ইসলামকে ফুল দিয়ে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানানো হয়।