বাংলাদেশের প্রথম সবাক চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’র ৬৬ বছর

title
১৫ দিন আগে
'মুখ ও মুখোশ' চলচ্চিত্রের দুটি পোস্টার (ইন্টারনেট থেকে নেয়া ছবি)। ‘প্রথম’ দিয়েই শুরু হয় সকল প্রথম কিছুর। সবার মনে গাঁথা থাকে সেই প্রথমটিই। বাংলাদেশও মনে রাখবে আজকের এ দিনটিকে। ১৯৫৬ সালের এই দিনে বাংলাদেশে মুক্তি পায় দেশের প্রথম সবাক চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’। রূপমহল সিনেমা হলে সিনেমাটির উদ্বোধন করেছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক। পরিচালনা করেছিলেন আবদুল জব্বার খান। একটা সময় পর্যন্ত ঢাকায় নিয়মিত চলতো ভারতীয় বাংলা, হিন্দি, পশ্চিম পাকিস্তানী ও হলিউডের সিনেমা। বাংলাদেশের কেউ সিনেমা বানানোর আগ্রহও দেখাননি আগে। এরকমই এক সময়ে, ১৯৫৩ সালে ঢাকায় এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। পূর্ব পাকিস্তানে আসলেই কোনো সিনেমা নির্মাণ করা সম্ভব কী না, সেটিই ছিল এ সভার মূল প্রতিপাদ্য। সে সভায় হুট করে এক ভদ্রলোক বলে বসলেন, পূর্ব পাকিস্তানের এমন গরম আবহাওয়ায় সিনেমা নির্মাণ সম্ভব নয়। লোকটি ছিলেন গুলিস্তান সিনেমা হলের মালিক খানবাহাদুর ফজল আহমেদ, অবাঙালি। একজন অবাঙালি এসে বলছেন, বাংলাদেশে সিনেমা নির্মাণ সম্ভব না, এ কথা শুনে বাঙ্গালীর আঁতে ঘা লাগাটাই স্বাভাবিক। ওই সভায় উপস্থিত ছিলেন আবদুল জব্বার খান। প্রতিবাদ করে তিনি বললেন, বাংলাদেশেও সিনেমা বানানো সম্ভব এবং তিনি বানাবেনও। দিয়ে বসলেন চ্যালেঞ্জও। এদিকে, তখনও চলচ্চিত্রের ‘চ’ও জানেন না আবদুল জব্বার খান। তিনি কী করে বানাবেন সিনেমা? ১৯৫৩ সালে নিজের লেখা ডাকাত নাটক নিয়েই তৈরি করলেন চিত্রনাট্য। কলকাতা থেকে পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে আনালেন পুরোনো মরচে ধরা এক ‘আইমো’ ক্যামেরা। শব্দ ধারণের জন্য ছিল একটি সাধারণ ফিলিপস টেপরেকর্ডার। ১৯৫৪ সালে ‘মুখ ও মুখোশ’-এর মহরত অনুষ্ঠিত হলো হোটেল শাহবাগে। কিন্তু মহরত তো হলো। অভিনেতাও পাওয়া যাচ্ছে। বিপত্তিটা ঘটলো অভিনেত্রীর ক্ষেত্রে। দেশের কোনো মেয়েই সিনেমায় আসতে চাচ্ছে না। রীতিমতো পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে অভিনেত্রী খোঁজা শুরু হলো। বিজ্ঞপ্তি দেখে এগিয়ে এলেন কয়েকজন আর তাদের নিয়েই শুরু হলো সিনেমার কাজ। মজার ব্যাপার হলো, এ সিনেমায় কাজ করার জন্যে কেউই কোনো পারিশ্রমিক নেননি। অভিনয় করেন পূর্ণিমা সেন, সাইফুদ্দিন, বিনয় বিশ্বাস, আব্দুল জব্বার খান, ইনাম আহমেদ, জহরত আজরাসহ আরও অনেকেই। শুটিং হয় বুড়িগঙ্গার ওপারে কালীগঞ্জ, লালমাটিয়ার ধানখেত, তেজগাঁওয়ের জঙ্গল ও টঙ্গীর তুরাগ নদের পাড়ে। ১৯৫৫ সালে শুটিং শেষ হয় মুখ ও মুখোশের। এরপর লাহোরের স্টুডিওতে শুরু হয় সম্পাদনা। সিনেমা তো হলো, এ সময়ই দেখা দিলো নতুন বিপত্তি। ঢাকার পরিবেশকেরা কেউই রাজি নন সিনেমাটি মুক্তি দিতে। অগত্যা, মুখ ও মুখোশ’ এর প্রথম প্রদর্শনী হয় লাহোরে। যদিও পরবর্তীতে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম এবং খুলনায় একযোগে প্রদর্শিত হয় সিনেমাটি।সিনেমাটি সেরকম ব্যবসা করতে না পারলেও পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম সবাক চলচ্চিত্র হিসেবে বেশ আগ্রহ সৃষ্টি করে। ৬০,০০০ রূপী ব্যয়ে নির্মিত এ সিনেমা ৪৮,০০০ রুপি আয় করে প্রথম দফাতেই। তবে সিনেমাটি কত আয় করলো বা কতটা ব্যবসাসফল ছিলো, তার চেয়েও বড় বিষয়- এটি এদেশের প্রথম সবাক চলচ্চিত্র। সবকিছু ছাপিয়ে এ সিনেমা আসলে এক বাঙ্গালীর চ্যালেঞ্জ জেতার গল্পও বটে। যে আবেগের বশে নেমেছিলেন সিনেমা বানাতে, যে ইতিহাসের জন্ম দিলেন তিনি, তা বাঙ্গালী ভুলবেও বা কীভাবে?/এসএইচ